‘বিক্ষোভের মুখে পিছু হটবে না ইরান, ট্রাম্পের হাত রক্তে রাঙা’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, চলমান বিক্ষোভের মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কোনোভাবেই পিছু হটবে না। তিনি আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ‘রক্তে রাঙা’। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে এসব কথা বলেন খামেনি।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) থেকে বিক্ষোভ বাড়তে থাকলেও এ বিষয়ে এটাই খামেনির প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য। ভাষণে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করেন। খামেনি বলেন, ট্রাম্পের ‘হাত এক হাজারেরও বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত’। তিনি বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে জুনে সংঘটিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে সমর্থন ও সরাসরি হামলা চালিয়েছে, তার দায়ও ওয়াশিংটনের ওপর বর্তায়।
খামেনি আরও দাবি করেন, ‘অহংকারী’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিণতিও ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ক্ষমতাচ্যুত ইরানি রাজতন্ত্রের মতোই হবে। তিনি বলেন, গত রাতে তেহরানে একদল ভাঙচুরকারী নিজেদেরই একটি ভবন ধ্বংস করেছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে খুশি করার জন্য। এ সময় তার সমর্থকরা ‘যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দেন।
খামেনি বলেন, সবাই জানে, শত শত হাজার ‘সম্মানিত’ মানুষের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নাশকতাকারীদের সামনে আমরা কখনোই পিছু হটবো না।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে ইরানের বিভিন্ন বড় শহরে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করে। বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরাচারের পতন চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন ও একাধিক সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন। ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায় রাস্তায় নামে বিপুলসংখ্যক মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ পুরো দেশে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ভোরে ইরান টানা ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণভাবে অফলাইনে ছিল, যা চলমান ব্যাপক বিক্ষোভ দমনের একটি প্রচেষ্টা।
বিশ্লেষকদের মতে, চার দশকের বেশি সময় ধরে টিকে থাকা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য এটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যেই ধর্মতান্ত্রিক শাসনের অবসানের দাবি জানাচ্ছেন।
এদিকে, বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানে সরকার উৎখাতের আগ্রহ ‘অবিশ্বাস্য রকমের’। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যার পথ বেছে নিলে ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করা হবে ও যুক্তরাষ্ট্র সে জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে তেহরানের বিশাল আয়াতুল্লাহ কাশানি বুলেভার্ডের একটি অংশে বিপুল জনসমাগম হয়। উত্তরাঞ্চলীয় শহর তাবরিজ, পূর্বের ধর্মীয় নগরী মাশহাদ ও কুর্দি অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলের কেন্দ্রীয় শহর কেরমানশাহসহ বিভিন্ন এলাকায়তেও বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।
কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রবেশপথে আগুন দেওয়ার দৃশ্যও ছড়িয়ে পড়ে, যদিও এসব ছবি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া মারকাজি প্রদেশের রাজধানী শাজান্দে গভর্নরের কার্যালয়েও আগুন জ্বলতে দেখা গেছে বলে ভিডিওতে দাবি করা হয়।
এদিকে, শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরকারের পক্ষে পাল্টা সমাবেশের চিত্র প্রচার করা হয়। সেখানে বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ সরকারের সমর্থনে স্লোগান দিতে দেখা যায়। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখিয়ে তেহরানের মেয়রের বরাত দিয়ে জানানো হয়, বিক্ষোভে ৪২টিরও বেশি বাস, সরকারি যানবাহন ও অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়েছে ও অন্তত ১০টি সরকারি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বিক্ষোভকে ২০২২-২৩ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড় বলে মনে করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। নরওয়ে-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস এই তথ্য জানিয়েছে।
তেহরান থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক ভিডিওগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ দেখা না গেলেও, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনী ‘নাশকতাকারীদের’ বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত ইরানের শাহের ছেলে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত রেজা পাহলভি বলেন, এই বিক্ষোভ দেখিয়েছে যে কীভাবে বিশাল জনসমাগম দমনমূলক শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে। তিনি শুক্রবার আরও বড় বিক্ষোভের আহ্বান জানান, যাতে ভিড় আরও বড় হয় ও সরকারের দমনক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
তথ্যসূত্র : এএফপি
(ওএস/এএস/জানুয়ারি ১০, ২০২৬)
