ঈশ্বরদী প্রতিনিধি : পাবনার ঈশ্বরদীতে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলসের আওতাধীন মুলাডুলি ইক্ষু খামারে কোনো ধরনের নিলাম বিজ্ঞপ্তি বা পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই তিন হাজারেরও বেশি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর একটি সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে এই ব্যাপক বৃক্ষনিধন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

গাছ কাটার ঘটনাটি এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এ ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

বিএডিসির ‘পানাসি’ (পাবনা–নাটোর–সিরাজগঞ্জ সেচ প্রকল্প) আওতায় ‘ভ্যালি ইরিগেশন’ নামে একটি কাজ শুরু করা হয়। এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে মুলাডুলি খামারের ক্যানালের দুই পাশে থাকা বহু বছরের পুরোনো মেহগনি, শিশু, খয়ের, রেইনট্রি, খেজুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে চলা এ কর্মযজ্ঞে বুধবার পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি গাছ কাটা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, বন বিভাগ থেকে গাছের মূল্য নির্ধারণ করে নিলাম বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গাছ বিক্রির নিয়ম থাকলেও এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়ার কোনো কিছুই অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

গাছ কাটার বিষয়ে শ্রমিকদের প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন, “আমরা হাজিরার বিনিময়ে গাছ কাটার কাজে এসেছি। এর বেশি কিছু জানি না।” কার নির্দেশে গাছ কাটা হচ্ছে—এমন প্রশ্নে শ্রমিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে কথা বলতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে। আমি কিছু জানি না।”

মুলাডুলি খামারের ইনচার্জ আনোয়ারুল ইসলাম আমিন গাছ কাটার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, কাটা গাছগুলো নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের জ্বালানি হিসেবে পাঠানো হয়েছে এবং সেচ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার কৃষিতে উপকার হবে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সবুজ পৃথিবী’-এর সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম এই ঘটনাকে অযৌক্তিক ও পরিকল্পনাহীন বৃক্ষনিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, “এতে খামারের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যোগাযোগ করা হলেও দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের জিএম (প্রশাসন) আনিসুর রহমানের কার্যালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফরিদ হোসেন ভূঁইয়া গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে কোনো মন্তব্য না করে খামার প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

এদিকে মুলাডুলি ইক্ষু খামারের ব্যবস্থাপক বাকি বিল্লাহর কার্যালয়ে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বিএডিসি ঈশ্বরদী জোনের সহকারী প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) সুমন চন্দ্র বর্মণ বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আপনারা জেলা পর্যায়ের প্রধান কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন।”

বিএডিসি পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা বন কর্মকর্তা ফসিউর রহমান জানান, বন বিভাগ থেকে গাছ কাটার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “দরপত্র ছাড়া কীভাবে এত বিপুলসংখ্যক গাছ কাটা হলো—তা জানতে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের খামার বিভাগকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। তিনি এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(এসকেকে/এসপি/জানুয়ারি ১২, ২০২৬)