রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি (অপরাধ বিজ্ঞান) বিভাগে ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এন্ড ফরেনসিক অ্যানালাইসিস ল্যাব (অপরাধ তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ পরীক্ষাগার) -এর উদ্বোধন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এক জমকালো অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে এই অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিটির শুভ উদ্বোধন করা হয়।

অনুষ্ঠানটির আয়োজক ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন ও সহযোগী অধ্যাপক শাহারিয়া আফরিনের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, পিএইচডি।

উপাচার্য তাঁর বক্তব্যে ল্যাবটির সাফল্য কামনা করে বলেন, 'দেশের অপরাধ বিজ্ঞান চর্চাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করছি'।

ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী নিশাত ও খালিদ-এর সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা ও বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান, অ্যাডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল মো. সিবগাত উল্লাহ, বিপিএম, পিপিএম। এছাড়া এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খান এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ল্যাবটির অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক অধ্যাপক ড. তৈয়বুর রহমান।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সহকারি প্রক্টর এবং ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানে ক্রিমিনোলজি বিভাগে তেরো বছরের পথচলার প্রধান মাইলফলক ও গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলো নিয়ে নির্মিত একটি বিশেষ তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। এরপর আগত অতিথিদের ফুলেল সংবর্ধনা ও তাঁদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।অনুষ্ঠানে নিজস্ব বিশেষায়িত এ ল্যাবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি গবেষণা উপস্থাপন করেন বিভাগের ৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাফসান ও আসিফ।

অনুষ্ঠানে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. তৈয়বুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, "সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বুকে ক্রিমিনোলজি একটি ছোট ডিপার্টমেন্ট হলেও গত ১৩-১৪ বছরে তারা অনেক ভালো কাজ করে যাচ্ছে। মাত্র অল্প সময়ের ব্যবধানে এই বিভাগটি অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে এবং এ ল্যাব তার একটি প্রমাণ'।

সিআইডি প্রধান মো. সিবগাত উল্লাহ, বিপিএম, পিপিএম তার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, 'বর্তমানে অপরাধের ধরন বা প্যাটার্ন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আমরা এখন AFIS (Automated Fingerprint Identification System) এবং ADs-এর মাধ্যমে আধুনিক সব কাজ করছি। এই ল্যাবটি শিক্ষার্থীদের অপরাধের আধুনিক গতিপ্রকৃতি বুঝতে সহায়তা করবে'।

কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, 'সমাজকে বোঝার মাধ্যমেই মূলত অপরাধকে বোঝা সম্ভব। যারা এ ল্যাবটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সাথে যুক্ত ছিলেন তাঁদের সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরো বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক জ্ঞানের প্রসারে এই ল্যাবটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে'।

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করে বলেন, '১৯৯৫ সাল থেকে এই অনুষদের অংশ হিসেবে কাজ করছি এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমি প্রশাসনিক দায়িত্ব পাই। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখবো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনে অনেক বিভাগ সৃষ্টি হয়েছে। পূর্বে অপরাধের ধরনগুলো সহজ ও কম ছিল, এমনকি আমাদের কিশোর বা তরুণ বয়সেও অপরাধের ধরণগুলো ছিল সরল। ফলে তা নির্ণয়ের পদ্ধতিও ছিল সহজ। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, সময়ের সাথে অপরাধের মাত্রা ও জটিলতা বেড়েছে। এই ক্রাইম ল্যাবটি অপরাধের বর্তমান ট্রেন্ডগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ণয়ে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে'।

আলোচনা পর্ব শেষে অতিথিবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিতা কেটে ‘ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এন্ড ফরেনসিক অ্যানালাইসিস ল্যাব’-এর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন শেষে একটি বিশেষ কেক কাটার মাধ্যমে এই আনন্দঘন মুহূর্তটি উদযাপন করা হয়। পুরো আয়োজনটি ক্রিমিনোলজির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সহযোগী অধ্যাপক শাহারিয়া আফরিন বলেন,'আজকের এই দিনে আমি হয়তো বেশি কথা বলতে পারবো না, কারণ আমি বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি। আজ আমাদের বিভাগের জন্য শ্রেষ্ঠতম একটি দিন। আপনাদের সকলের সহযোগিতায় আজ এই ল্যাব উদ্বোধন সম্ভব হয়েছে। আগামীর পথচলাতেও আমি আপনাদের সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।'

অনুষ্ঠানের শেষভাগে উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ, শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা তাঁদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। ক্রিমিনোলজি কালচারাল ক্লাবের পক্ষে ওই বিভাগের ৭ম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবরার, স্মরণ ও রিয়াদের অভিনয়ে চমৎকার একটি নাটিকা মঞ্চস্থ করার মধ্যদিয়ে শেষ হয় ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এন্ড ফরেনসিক অ্যানালাইসিস ল্যাবের উদ্বোধন অনুষ্ঠান।

উল্লেখ করা যেতে পারে, অপরাধ তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ পরীক্ষাগার (Crime Lab) হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অপরাধস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত (ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, অস্ত্র, বিষাক্ত পদার্থ) পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের বিশেষায়িত স্থান। এটি অপরাধীকে শনাক্ত করতে এবং আদালতে বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ উপস্থাপনে পুলিশ ও বিচার বিভাগকে সহায়তা করে থাকে। বাংলাদেশে সিআইডি (CID) ও আইটি ফরেনসিক ল্যাবগুলো এই দায়িত্ব পালন করে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের নিজস্ব 'ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এন্ড ফরেনসিক অ্যানালাইসিস ল্যাব' এর উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের অপরাধ বিজ্ঞান চর্চার নতুন সম্ভাবনা দুয়ার খুলে দিলো। যা সময়ের চাহিদায় দেশের অপরাধ বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা প্রকাশ করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

(আরআর/এএস/জানুয়ারি ১৫, ২০২৬)