উন্নয়ন নীতিতে সংস্কৃতি কেন অপরিহার্য উপাদান
ওয়াজেদুর রহমান কনক
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি সাধারণত অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্যগুলোর সফল বাস্তবায়ন গভীরভাবে সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল। মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, জীবনযাপন ও সামাজিক আচরণই নির্ধারণ করে উন্নয়ন কতটা গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হবে। শিক্ষা থেকে শুরু করে লিঙ্গসমতা, বৈষম্য হ্রাস, নগর উন্নয়ন, জলবায়ু সচেতনতা কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংস্কৃতি মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তাই এসডিজি ও সংস্কৃতির আন্তঃসম্পর্ক বোঝা মানে উন্নয়নকে মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং তাকে দীর্ঘস্থায়ী ও মানবিক করে তোলা।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Sustainable Development Goals—SDGs) কেবল অর্থনীতি, অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির নীতিমালা নয়; এগুলো গভীরভাবে সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক বয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংস্কৃতি এখানে কোনো আনুষঙ্গিক উপাদান নয়, বরং মানবিক উন্নয়নের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। এসডিজি ও সাংস্কৃতিক আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, টেকসই উন্নয়ন তখনই কার্যকর হয়, যখন তা স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জ্ঞানব্যবস্থা ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সংলাপ স্থাপন করতে পারে।
এসডিজি ৪—গুণগত শিক্ষা—এর ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক শিক্ষাব্যবস্থা একটি মৌলিক শর্ত। শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষানির্ভর ও দক্ষতা-কেন্দ্রিক হয়, তবে তা মানবিক চেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। সাংস্কৃতিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের ইতিহাস, ভাষা, লোকজ জ্ঞান, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করে। আদিবাসী ও স্থানীয় জ্ঞানব্যবস্থা, লোককথা, সংগীত, নৃত্য ও শিল্পকলাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষা হয়ে ওঠে প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত। এতে শিক্ষার্থী কেবল তথ্য আহরণ করে না, বরং নিজের পরিচয়, সমাজ ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক বুঝতে শেখে। ফলে এসডিজি ৪-এর লক্ষ্য—সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও আজীবন শিক্ষার সুযোগ—বাস্তব রূপ পায়।
এসডিজি ৫—লিঙ্গসমতা—লোকসংস্কৃতি ও নারীর ভূমিকার আলোচনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে। প্রচলিতভাবে লোকসংস্কৃতিকে অনেক সময় পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বাহক হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়—লোকগান, পালাগান, আচার-অনুষ্ঠান ও মৌখিক সাহিত্যে নারীর শ্রম, জ্ঞান ও নেতৃত্বের বহু নিদর্শন রয়েছে। নারীর অভিজ্ঞতা, মাতৃত্ব, উৎপাদনমূলক কাজ ও সামাজিক প্রতিরোধ লোকসংস্কৃতির ভেতরেই সংরক্ষিত। এই সাংস্কৃতিক সম্পদকে পুনর্পাঠ ও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে নারীর অবদান দৃশ্যমান করা যায়। এতে লিঙ্গসমতা কেবল আইনি অধিকার বা নীতিগত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সাংস্কৃতিক স্বীকৃতিতে রূপ নেয়, যা সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তনে অধিক কার্যকর।
এসডিজি ১০—বৈষম্য হ্রাস—প্রান্তিক সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রধানধারার সংস্কৃতি প্রায়ই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা, জীবনধারা ও বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে। এর ফলে উন্নয়ন নিজেই বৈষম্যের নতুন রূপ তৈরি করে। সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি মানে কেবল প্রতিনিধিত্ব নয়; এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জ্ঞান উৎপাদন ও সম্পদ বণ্টনের প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক সংস্কৃতির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ভাষাগত অধিকার, সাংস্কৃতিক প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিজস্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণের সুযোগ দিলে সামাজিক ন্যায়বিচার সুদৃঢ় হয়। এভাবে সংস্কৃতি বৈষম্য হ্রাসের একটি কার্যকর নীতি-উপাদানে পরিণত হয়।
এসডিজি ১১—টেকসই শহর ও জনপদ—এর সঙ্গে ঐতিহ্য সংরক্ষণের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নগরায়ন যদি কেবল আধুনিক স্থাপত্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে ঐতিহাসিক স্থাপনা, পুরনো পাড়া-মহল্লা, সামাজিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক অনুশীলন বিলুপ্ত হয়। টেকসই শহর মানে এমন নগর, যেখানে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সংলাপ থাকে। ঐতিহ্য সংরক্ষণ কেবল পর্যটনের জন্য নয়; এটি নাগরিক পরিচয়, সামাজিক সংহতি ও মানসিক সুস্থতার অংশ। সাংস্কৃতিক স্থান, উন্মুক্ত চত্বর, লোকজ শিল্প ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করলে শহর মানবিক ও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
এসডিজি ১৩—জলবায়ু কার্যক্রম—এ পরিবেশবান্ধব সাংস্কৃতিক বয়ানের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈজ্ঞানিক সমস্যা হলেও এর সমাধান সাংস্কৃতিক আচরণ ও মূল্যবোধের পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। বহু আদিবাসী ও স্থানীয় সংস্কৃতিতে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের নীতি বিদ্যমান, যেখানে ভোগের সীমা, ঋতুচক্রের প্রতি সম্মান এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার শিক্ষা অন্তর্নিহিত। এই সাংস্কৃতিক বয়ানগুলো আধুনিক পরিবেশ আন্দোলনকে নৈতিক ভিত্তি দেয়। জলবায়ু নীতি যদি স্থানীয় সাংস্কৃতিক জ্ঞানকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তা জনগণের অংশগ্রহণ ও দায়িত্ববোধ বাড়াতে সক্ষম হয়।
এসডিজি ১৬—শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান—এর ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক সংলাপ একটি অপরিহার্য উপাদান। সংঘাতের মূল কারণ অনেক সময় সাংস্কৃতিক ভুলবোঝাবুঝি, পরিচয় সংকট ও ঐতিহাসিক ক্ষোভে নিহিত থাকে। সাংস্কৃতিক সংলাপ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া তৈরি করে। শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও স্মৃতিচর্চা সহিংসতার বিকল্প ভাষা প্রদান করে, যেখানে মানুষ অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে পারে। ন্যায়বিচার তখনই টেকসই হয়, যখন তা সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) কার্যক্রমে সংস্কৃতি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি মানব উন্নয়ন, নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে পরিমাপযোগ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। UNESCO Institute for Statistics (UIS)–এর তথ্যে দেখা গেছে যে এসজিডি-১১ টার্গেট-১১ “বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ বৃদ্ধি”-এর অধীনে SDG Indicator ১১.৪.১ অনুযায়ী সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে ব্যয় (public + private) মাথাপিছু হিসাব করে বহু দেশের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এই তথ্য ব্যবস্থা ২০২০ সালে প্রেক্ষিত হিসাবে সীমিত ছিল, কিন্তু ২০২৩ সালে সেই পর্যবেক্ষণ ডেটার কাভারেজ বেড়ে এখন ৮২টি দেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা নির্দেশ করে যে বিভিন্ন দেশ ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে অর্থ বরাদ্দ করছে এবং তা এসজিডি পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে রিপোর্ট করছে। এই উদ্যোগই দেখায় যে সংস্কৃতি সংরক্ষণ কোষ্ঠকাঠিন্যের বাইরে বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
এসডিজি বাস্তবায়নে সংস্কৃতিকে পরিমাপযোগ্য করার আরো একটি বড় কাঠামো হলো UNESCO-র Culture|2030 Indicators প্রকল্প, যা ২২টি থিম্যাটিক সূচকের মাধ্যমে সংস্কৃতির অবদানকে গবেষণা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অংশগ্রহণ ও নীতি-সমন্বয়ের মতো দিক থেকে ট্র্যাক করে। এই সূচকগুলো শিক্ষা, অর্থনীতি, পরিবেশ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও শান্তি-সংলাপ সহ বিভিন্ন SDG-র লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে পরিমাপযোগ্য করে তোলে এবং সিদ্ধান্ত-গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথ্য-ভিত্তিক নীতি নির্ধারণে সাহায্য করে।
এই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ডাটা ভিত্তি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে সংস্কৃতি কেবল ঐতিহ্য রক্ষা বা লোকজ চর্চা নয়; বরং এটি একটি পরিমাপযোগ্য জনকল্যাণ ও উন্নয়ন সূচক, যেখানে গণসংখ্যা, সরকারি ব্যয়, শিক্ষা ও নীতি-মূল্যায়ন মিলিয়ে সাংস্কৃতির ভূমিকা SDG-র অগ্রগতি নিরীক্ষণে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। UNESCO-র তথ্যে সংস্কৃতি এসজিডি-১১ -এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত একটি লক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা এসজিডি-৪ কর্মসংস্থান ও সমন্বিত উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এটির আন্তঃসম্পর্কও ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে, যা উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাইরে মানবিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করছে।
এই বৈজ্ঞানিক নথিভুক্ত পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে সাংস্কৃতি এসজিডি-র কাঠামোর একটি বাস্তব, পরিমাপযোগ্য ও নীতি-সমর্থিত উপাদান, যা উন্নয়ন কার্যক্রমের সব পর্যায়ে তথ্য-ভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকে শক্তিশালী করছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
