ঈশ্বরদী প্রতিনিধি : ঈশ্বরদীতে চিরকুট লিখে অপরিচিত এক নারীর কোলে রেখে যাওয়া সেই নবজাতক শিশুটির বাবা–মায়ের পরিচয় পাওয়া গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সহায়তায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুটিকে তার প্রকৃত বাবা–মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে এ ঘটনা ঘটে। পরে বিকেল ৫টার দিকে পুলিশি যাচাই–বাছাই শেষে শিশুটিকে তার বাবা–মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

শিশুটির বাবা মো. ইমারুল প্রামাণিক ও মা মোছা. মুক্তা খাতুন। তারা উপজেলার দাশুড়িয়া নওদাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জ্বর ও ঠান্ডাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত স্বামীকে চিকিৎসা করাতে আসা জয়নগর গ্রামের মোছা. মিষ্টি আক্তার নামে এক নারীর কোলে শিশুটিকে দিয়ে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে সেখান থেকে সরে পড়েন মা মুক্তা খাতুন। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তিনি আর শিশুটিকে নিতে ফিরে আসেননি।

একপর্যায়ে শিশুটির শরীরে জড়ানো কাপড়ের ভেতর একটি চিরকুট পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিল— ‘আপনি বাচ্চাটিকে হেফাজতে রাখবেন। বাচ্চার জন্ম ১ জানুয়ারি।’ চিরকুটে একটি মোবাইল নম্বরও লেখা ছিল।

পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও পুলিশ ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে মো. আশরাফ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। তিনি সম্পর্কে শিশুটির বাবা ইমারুল প্রামাণিকের বড় ভাইয়ের জামাই। তবে তার নম্বর চিরকুটে কেন লেখা হয়েছিল—সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিশুটির বাবা ইমারুল প্রামাণিক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে এসে শিশুটি তার সন্তান বলে দাবি করেন। পরে তার স্ত্রী মুক্তা খাতুনকে হাসপাতালে ডেকে আনা হলে তিনি শিশুটিকে কখনো নিজের বলে স্বীকার করেন, আবার কখনো অস্বীকার করেন। একপর্যায়ে শিশুটি ছিনতাই হয়েছে বলেও দাবি করে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেন তিনি।

পরবর্তীতে শিশুর জন্মের সময় উপস্থিত আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, শিশুটির প্রকৃত বাবা–মা ইমারুল প্রামাণিক ও মুক্তা খাতুনই। এরপর থানায় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে শিশুটিকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে শিশুটিকে কেন অন্যের কোলে রেখে এমন নাটকীয় ঘটনার সৃষ্টি করা হয়েছে—এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি মা মুক্তা খাতুন।

শিশুর জন্মের সময় পাশে থাকা চাচি মোছা. ডলি খাতুন বলেন, “শিশুটি তাদেরই। সকাল ১১টার দিকে মুক্তা খাতুনকে শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতালে আসতে দেখেছি। সিসি ক্যামেরায় যে ওড়না পরা নারীকে দেখা গেছে, সেই একই ওড়না পরে তিনি এসেছিলেন। কিন্তু কেন এমন কাজ করলেন, বুঝতে পারছি না।”

শিশুর বাবা মো. ইমারুল প্রামাণিক বলেন, “আমি সকালে কাজে চলে যাই। স্ত্রী যে শিশুটিকে হাসপাতালে এনেছে, তা জানতাম না। পরে শুনি আমার স্ত্রী শিশুটি হারিয়ে ফেলেছে বলে কান্নাকাটি করছে। চিরকুটে থাকা নম্বরটি আমার বড় ভাইয়ের জামাইয়ের। তিনিই আমাকে ফোন করে জানান হাসপাতালে একটি শিশু পাওয়া গেছে। এসে দেখি, এটাই আমার সন্তান। কিন্তু স্ত্রী কেন এমন করেছে, তা আমি জানি না।”

ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. আলী এহসান বলেন, “এক নারী শিশুটিকে নিয়ে আমার কাছে এলে তার কাপড়ের ভেতর একটি চিরকুট পাওয়া যায়। পরে পুলিশকে অবহিত করে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে শিশুটির মা–বাবার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পুলিশের সহায়তায় শিশুটিকে নিরাপদে তার বাবা–মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

ঈশ্বরদী আমবাগান পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনার কারণ জানতে চাওয়া হলেও শিশুর মা কোনো কিছুই স্বীকার করেননি। তবে যাচাই–বাছাই শেষে শিশুটির বাবা–মা নিশ্চিত হওয়ায় সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিশুটিকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

(এসকেকে/এসপি/জানুয়ারি ২০, ২০২৬)