ভারতীয় কূটনৈতিকদের পরিবার প্রত্যাহার
সংকট, বাস্তবতা ও বৈদেশিক নীতিতে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের নাম
দেলোয়ার জাহিদ
কোনো দেশ থেকে কূটনৈতিকদের পরিবার প্রত্যাহার সাধারণত শান্ত ও পরিকল্পিত কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং তা প্রায়ই চরম অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার মধ্যেই সংঘটিত হয়। শেষ মুহূর্তের ফ্লাইট, হামলার আশঙ্কায় থাকা কনভয়, সীমিত সময়ের মধ্যে সামরিক সম্পৃক্ততা—এসবই এমন উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দূতাবাসের কর্মী ও তাঁদের পরিবারগুলোর জন্য—যাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে বিদেশে বসবাস করেছেন—এ ধরনের সিদ্ধান্ত মানে একটি স্বাভাবিক জীবনযাত্রার আকস্মিক বিচ্ছিন্নতা, তীব্র মানসিক চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা।
তবুও বাস্তবতা হলো, আধুনিক পররাষ্ট্রনীতিতে এ ধরনের উচ্ছেদ একটি অপরিহার্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ইতিহাস হঠাৎ করে যখন বিপজ্জনক মোড় নেয়, তখন কূটনীতিকদের পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে থাকা পরিবারগুলো যেন কোনোভাবেই ক্ষতির মুখে না পড়ে—এটি নিশ্চিত করাই এসব সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: ভারতের সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত
নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে নেওয়া এই পদক্ষেপকে সরকারি সূত্রগুলো “সতর্কতামূলক ব্যবস্থা” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের বরাতে জানা যায়, ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ভারতীয় কর্মকর্তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের সাময়িকভাবে ভারতে ফিরে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—কূটনৈতিক মিশন বন্ধ করা হয়নি; বরং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক কার্যক্রম চালু রেখেই পরিবারগুলোর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। (ইত্তেফাক ডিজিটাল ডেস্ক, ২০ জানুয়ারি ২০২৬)
কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা ও সংকটের বাস্তবতা
প্রচলিত কূটনৈতিক ব্যবস্থায় একটি দেশের দূতাবাস ও মিশনের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিজ দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন কোনো আয়োজক দেশের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়ে—যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ কিংবা আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে—তখন কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারগুলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়—স্বাভাবিক কূটনৈতিক জীবন থেকে সরে এসে ‘সংকট ব্যবস্থাপনা মোডে’ প্রবেশ করতে হয়। পরিবার প্রত্যাহার সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইতিহাসের দৃষ্টান্ত: ইয়েমেন ও সুদান
২০১৫ — ইয়েমেন: হুথি অগ্রগতি ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
গত এক দশকের শুরুতে ইয়েমেনি গৃহযুদ্ধ ছিল কূটনৈতিক উচ্ছেদের এক বড় উদাহরণ। হুথি বিদ্রোহীরা সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে একাধিক কূটনৈতিক মিশন কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরব ও মিত্র বাহিনী এডেন থেকে কূটনীতিক ও জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেয়। পাকিস্তান বিশেষ বিমানের মাধ্যমে নাগরিক ও বিদেশি কর্মীদের উদ্ধার করে।
ভারত শুরু করে অপারেশন রাহাত—যার মাধ্যমে আকাশ ও সমুদ্রপথে হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিক এবং শত শত বিদেশি নাগরিককে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণে উঠে আসে বিশৃঙ্খল বন্দরের চিত্র, সমুদ্রে অপেক্ষমাণ জাহাজ, এবং বিমান হামলার মধ্যেই নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে ক্লান্ত কূটনীতিকদের নিরলস প্রচেষ্টা। স্থানীয় প্রশাসনের অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়—সংকটের মুহূর্তে কূটনৈতিক নিয়মকানুন কত দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।
২০২৩ — সুদান: ‘অপারেশন রাউস আউস খার্তুম’
দশকের অন্যতম নাটকীয় উচ্ছেদ ঘটে ২০২৩ সালে সুদানে। জাতীয় সেনাবাহিনী ও র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের সংঘর্ষ খার্তুমকে নগর যুদ্ধে পরিণত করে।
২২–২৫ এপ্রিল: তীব্র লড়াই সরবরাহ রুট বন্ধ করে দেয় এবং বিদেশি মিশনগুলোকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে।
২৩ এপ্রিল: পশ্চিমা দেশগুলো কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারদের জন্য আসন্ন বিপদের কথা উল্লেখ করে জরুরি উচ্ছেদ পরিকল্পনা কার্যকর করে।
জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, নরওয়ে, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ বহু দেশ যৌথ ও পৃথকভাবে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও সমন্বিত প্রচেষ্টায় দূতাবাসের কর্মী ও পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেয়।
এসব উদাহরণ কী নির্দেশ করে
ইয়েমেন (২০১৫), সুদান (২০২৩), মধ্যপ্রাচ্য (২০২৫) এবং বাংলাদেশ (২০২৬)—এই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সংঘটিত উচ্ছেদগুলো কয়েকটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট করে:
কূটনীতি মূলত মানবিক: মানুষের জীবন রক্ষা প্রায় সব বৈদেশিক নীতিগত সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকে।
নিরাপত্তাই নীতিনির্ধারক: পরিবার প্রত্যাহার প্রায়ই দূতাবাস বন্ধ বা কূটনৈতিক সম্পর্কের বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেয়।
লজিস্টিক সক্ষমতার পরীক্ষা: চাপের মধ্যে বিমান, সামরিক সহায়তা ও স্থানীয় অনুমতি দ্রুত সমন্বয় করা রাষ্ট্রের প্রস্তুতির মানদণ্ড।
যোগাযোগ হয়ে ওঠে জীবনরেখা: সংকটকালে দূতাবাস নাগরিক ও পরিবারের জন্য কার্যত একটি জরুরি সহায়তা কেন্দ্রে রূপ নেয়।
সামনে তাকিয়ে: কূটনৈতিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ
আঞ্চলিক যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হাইব্রিড হুমকির যুগে রাষ্ট্রগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে আগাম প্রস্তুতিতে। পূর্ব-নির্ধারিত উচ্ছেদ চুক্তি, যৌথ বহুজাতিক উদ্ধার ব্যবস্থা, এবং রিয়েল-টাইম নিরাপত্তা নজরদারি এখন কূটনৈতিক নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দূতাবাসগুলোর জন্য নিয়মিত সিমুলেশন অনুশীলনও বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
বিশ্ব রাজনীতির সংকটগুলো যখন সম্পর্কের গতিপথ বদলে দিচ্ছে, তখন এসব উচ্ছেদের গল্প আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—কূটনীতি শুধু সম্মেলন কক্ষে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অনেক সময় ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে বাস্তব মানুষ ও পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠিন সিদ্ধান্তের নাম।
লেখক : স্বাধীন রাজনীতি বিশ্লেষক, মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জূর্নালিস্ট নেটওয়ার্ক এর সভাপতি (এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা)।
