মোঃ ইমদাদুল হক সোহাগ


ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এখন আর কেবল বৃহৎ শক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্র নয়; বরং এটি এমন এক সংজ্ঞায়িত অঙ্গন যেখানে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু যখন চূড়ান্তভাবে এই অঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে, বাংলাদেশ তখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের কাছ থেকে কেবল প্রতিক্রিয়ামূলক নয়, বরং সুদূরপ্রসারী এবং স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে।

বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার (GPC) এই যুগে জাতীয় নিরাপত্তার প্রথাগত ধারণা—যা একসময় কেবল আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল—তা এখন আর যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান শক্তির জন্য নিরাপত্তা আজ একটি বহুমুখী বিষয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত শাসন এবং নৈতিক নেতৃত্ব এখন আর গৌণ বিষয় নয়; বরং এগুলো রাষ্ট্রের সক্ষমতার মূল স্তম্ভ।

ভৌগোলিক সীমানার বাইরে: সমসাময়িক হুমকির স্বরূপ

দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী স্থানে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান যেমন বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি দেশটিকে আন্তঃদেশীয় ঝুঁকির মুখেও ফেলেছে। ঢাকা যখন আঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু (Connectivity Hub) হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তখন বিশ্বায়নের নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতিও সমান দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

সীমান্তবর্তী মাদক ব্যবসা, চোরাচালান নেটওয়ার্ক এবং অবৈধ অর্থ প্রবাহ এখন আর কেবল সাধারণ আইন-শৃঙ্খলাজনিত চ্যালেঞ্জ নয়। এগুলো মূলত এক ধরণের ‘অর্থনৈতিক নাশকতা’—যা জাতীয় সম্পদ গ্রাস করছে, স্থানীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সুপরিকল্পিতভাবে যুবসমাজকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এই বিষয়গুলো মোকাবিলা করা না গেলে তা কেবল সামাজিক সংহতিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলবে।

সীমান্তবর্তী অঞ্চল: কৌশলগত পরিকল্পনার বিচ্ছিন্ন অংশ

সীমান্তবর্তী এলাকার শাসনব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে: আর তা হলো অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার এক অশুভ আঁতাত। দশকের পর দশক ধরে নির্দিষ্ট কিছু সীমান্ত অঞ্চল অপরাধী সিন্ডিকেটের জন্য অনানুষ্ঠানিক করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে প্রশাসনিক শিথিলতা এবং নেতৃত্বের ঘাটতিকে কাজে লাগানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন স্থানীয় পর্যায়ের এই দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। মাঠপর্যায়ে বিশ্বস্ত, নৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া এই অপরাধী চক্রগুলো কখনোই নির্মূল হয় না; তারা কেবল নিজেদের কৌশল বদলে নেয়। তাই সীমান্ত নিরাপত্তাকে কেবল টহল বৃদ্ধি বা নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটি শেষ পর্যন্ত স্থানীয় শাসনের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ওপর নির্ভর করে। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ এখন আর পেশীশক্তির রাজনীতি চায় না; তারা এমন এক নেতৃত্ব চায় যারা পরিচ্ছন্ন, যোগ্য, বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন এবং জনগণের আস্থার প্রতীক।

কৃষি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা: একটি উপেক্ষিত যোগসূত্র

জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম একটি উপেক্ষিত দিক হলো কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। এই অঞ্চলগুলো বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের মেরুদণ্ড। যখন স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ে, তখনই তারা আন্তঃদেশীয় অপরাধমূলক চক্রের সহজ শিকারে পরিণত হয়।

এক্ষেত্রে একটি কৌশলগত চিন্তার পরিবর্তন জরুরি। সীমান্ত এলাকায় ‘কৃষি-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ে তোলা—যেখানে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বৈধ বাণিজ্যের সুযোগ থাকবে—তা একটি শক্তিশালী ‘নন-কাইনেটিক’ নিরাপত্তা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। এই পদ্ধতি কেবল আয় বৃদ্ধিই করবে না, বরং জবরদস্তির পরিবর্তে সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রের উপস্থিতিকে শক্তিশালী করবে এবং যুবসমাজকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে মর্যাদাপূর্ণ বিকল্প পেশার পথ দেখাবে।

‘বুদ্ধিবৃত্তিক সীমান্ত’ অভিমুখে

ইন্দো-প্যাসিফিক যুগে বাংলাদেশকে কেবল ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখানোর নীতি থেকে সরে এসে একটি সক্রিয় এবং জ্ঞান-ভিত্তিক নিরাপত্তা অবস্থানের দিকে যেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সীমান্ত’ নির্মাণ—এমন একটি কাঠামো যেখানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো কেবল শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং তথ্য-উপাত্ত, নীতি-নৈতিকতা এবং স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে নির্ধারিত হবে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ‘ব্লু-ইকোনমি’ রক্ষা করার বিষয়টি স্থল সীমান্তের স্থিতিশীলতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; একটির দুর্বলতা অন্যটিকে নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

নেতৃত্ব এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন

বাংলাদেশের বর্তমান রূপান্তরকাল এমন এক নেতৃত্বের দাবি রাখে যারা তৃণমূলের বাস্তবতার সাথে বৈশ্বিক কৌশলগত সচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ এবং প্রশ্নাতীত সততার অধিকারী পেশাদারদের অন্তর্ভুক্তি এখন আর কোনো বিকল্প নয়—এটি একটি জাতীয় অপরিহার্যতা। একইভাবে, জননেতৃত্বের জন্য ‘ভেটিং’ বা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং আপোসকামী শাসনব্যবস্থা কখনো একসাথে চলতে পারে না। রাষ্ট্রকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, অবৈধ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তি যেন কোনোভাবেই প্রভাব বিস্তারকারী অবস্থানে আসতে না পারে।

আগামীর পথ

বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের মুখোমুখি। জাতীয় নিরাপত্তার সাথে অর্থনৈতিক কৌশলের সমন্বয় এখন আর কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়—এটি একটি ব্যবহারিক বাস্তবতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, আমরা প্রায় ১৭ কোটি ১৫ লাখের (১৭১.৫ মিলিয়ন) বেশি মানুষের এক জাতি, যাদের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এই সম্ভাবনা তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাগুলো স্বচ্ছ হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের চেয়ে নৈতিক নেতৃত্ব অগ্রাধিকার পাবে। ইন্দো-প্যাসিফিক শতাব্দীতে বাংলাদেশের শক্তি কেবল তার অস্ত্রাগার দিয়ে পরিমাপ করা হবে না; বরং তা নির্ধারিত হবে নীতিনির্ধারণী সাহসিকতা, সুশাসনের সততা এবং দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির বিচক্ষণতা দিয়ে।

লেখক : একজন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট এবং উদ্যোক্তা।