তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ভয়াবহতা কেমন হবে?
চৌধুরী আবদুল হান্নান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংশের ভয়াবহতা দেখে বিশ্ববাসী আতংকিত হয়েছিল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ব হলে পৃথিবীতে কেমন ধ্বংসযজ্ঞ হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইন্সটাইন বলেছিলেন- “তা বলতে পারবো না, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি-সোটা দিয়ে, আদিম যুগের মারামারির মতো। কারণ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীর সকল অস্ত্র-গোলাবারদ ধ্বংস হয়ে যাবে।”
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত একজন মানুষকে গুপ্ত হত্যাকে কেন্দ্র করে। তৎকালীন সময়ের অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রান্জ ফার্দিনান্দকে ১৯ বছর বয়সী “ইয়ং বসনিয়া” নামক বিপ্লবী গোষ্ঠীর এক সদস্য অতর্কিত হামলা করে হত্যা করে। এটা ১৯১৪ সালের জুন মাসের ঘটনা। এমনিতেই ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক চরম শত্রুতাভাবাপন্ন ছিল, এ অবস্থায় যুবরাজের হত্যাকান্ড যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিলো।
পুরো পৃথিবী ৪ বছর জুড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করলো। বলা হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহীত ছিল। যুদ্ধ শেষে জার্মানির ওপর চাপানো অপমানজনক চুক্তি, কয়েকটি শক্তশালী দেশের সর্বগ্রাসী এবং সাম্রাজ্যবাদী মনেভাবের কারণে মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।
একই শতাব্দীতে মানব জাতি দুইটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে। আরেকটা যূদ্ধ হলে, তা হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কেউ বেঁচে থাকবে না, পুরো পৃথিবী পরিণত হবে মহা শ্মশানে। সে যুদ্ধ হবে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাশাকিতে আনবিক বোমা বিস্ফোরণের মতোই নয়, তার চেয়ে অনেকগুণ ভয়ানক, লোমহর্ষক। কারণ তখন ছিল পারমানবিক অস্ত্রের শিশুকাল এবং প্রাথমিক ব্যবহার, যুক্তরাষ্ট্রের টেস্ট কেস । ইতিমধ্যে উন্নত দেশগুলোর বিজ্ঞানীদের হাতে সেগুলো কতটা বিধ্বংসী ক্ষমতা অর্জন করেছে, সে বিষয়ে কারও ধারনা নেই।
এখন যুদ্ধ হবে ঘরে বসে, রিমোর্ট কন্ট্রলের মাধ্যমে। দেখা যাবে নিমিশে একটি দেশের রাজধানী মাটির সাখে মিশে গেছে। যে কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল, এর চেয়ে অনেক বড় বড় কারণ সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীতে ঘটে চলেছে কিন্ত বিশ্বযুদ্ধ বাধেনি। মানুষের কিছুটা বোধোদয় হয়েছে, ধৈর্য ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, বলতেই হবে। মানুষ হয়তো বুঝতে শিখেছে যুদ্ধে আসলে কোনো পক্ষেরই জয় হয় না, সকল পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারও বেশি ক্ষতি হয়, কারও কম।
পৃথিবীতে বর্তমান সময়ে এমন সব ঘটনা ঘটে চলেছে যার যে কোনো একটির কারণেই আরেকটা বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হতে পারে। মার্কিন বাহিনী হেলিকপ্টার নিয়ে ভেনেজুয়েলার রাজধানী থেকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে স্ত্রীসহ অপহরণ করার ঘটনা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের একটি ভয়ঙ্কর নমুনা।
২০২০ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের রাজধানী বাগদাদে অবস্হানকালে ইরানি জেনারেল আরব বিশ্বের বীর হিসেবে পরিচিত কাশেম সোলেইমানিকে ড্রোন হামলা করে হত্যা করা হয়েছিল এবং তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্যে কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের হিটলিস্টে ছিলেন তিনি।
চির বৈরী ইরান-মার্কিন উত্তেজনা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এবার ডোনাল্ট ট্রাম্পের নজর পড়েছে দ্বীপ দেশ গ্রিনল্যান্ডের দিকে, এখন তা দখল করে নিতে হবে; কারণ প্রাকৃতিক সম্পদে সম্মৃদ্ধ বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপটি তার খুবই পছন্দ হয়েছে।
জনবিরল ২২ লক্ষাধিক বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এটি ডেনমার্কের একটি স্বশাসিত অঞ্চল, নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না।
কিন্ত ট্রাম্পের ইচ্ছা বলে কথা! এ যেন মায়ের কোল থেকে শিশু অপহরণ। তবে এমন ইচ্ছা পুরণ এত সহজ হবে না। কারণ ডেনমার্ক সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য, চুক্তি অনুযায়ী কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে দেশটিকে রক্ষায় এগিয়ে আসবে অন্য সদস্যদেশগুলো। এ জোটে রয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেনের মতো শক্তিশালী দেশ।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে বসলে ফ্রান্স ও ব্রিটেন জার্মনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। ঘটনা প্রবাহে আমরা যুদ্ধের উপাদান দেখি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হলোকাষ্ট আর গ্যাস চেম্বারে মানুষ হত্যার মহোৎসবের বিভীষিকাময় স্মৃতি আজও মানুষের মনে ম্লান হয়নি।
গাজায় হাসপাতালে যখন ইসরায়েলি হামলায় ৫ শতাধিক লোকের মৃত্যু দেখ, ৩ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু দেখি; নির্মমতার সীমা থাকে না। ঘটনা প্রবাহের নৃশংসতা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, যুদ্ধ আর নিষ্ঠুরতার প্রতীক হিটলারের বংশধররা পৃথিবীতে আজও দাপটের সাথে বিচরণ করে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্য রাষ্ট্র দখল করার আগ্রাসী আকাঙ্খা থামাতে পারে, পৃথিবীতে এমন কোনো একক রাষ্ট্র নেই।
সম্প্রতি তিনি নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, শুধু শান্তির কথা ভাবতে বাধ্যবাদকতা অনুভব করছেন না তিনি, কারণ বিশ্ব শান্তির জন্য এত এত কাজ করার পরও তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি।
স্বার্থ চরিতার্থে কাজ করতে চাইলে অজুহাত বা ছলনার অভাব হয় না। তবে কি কেবল শক্তিমানরাই পৃথিবীতে টিকে থাকবে, দুর্বলেরা হারিয়ে যাবে?
পৃথিবীব্যাপী ধারাবাহিক স্বেচ্ছাচারিতার ফলে তিনি নিজ দেশে অপ্রীয় হতে থাকলে, মার্কিন সিনেট কর্তৃক অভশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুতির আশঙ্কা অনুভব করলে ট্রাম্প থামলেও থামতে পারেন।সেক্ষেত্রে সারা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় সব মানুষ বিশ্ব শান্তির পক্ষে সোচ্চার হতে হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম, সোনালী ব্যাংক।
