মানিক লাল ঘোষ


রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাস গবেষকদের দৃষ্টিতে— বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তিল তিল করে গড়ে ওঠা আত্মত্যাগের এক দীর্ঘ পরম্পরা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা যে বিজয়মুকুট পরেছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৯৬৯-এর অগ্নিঝরা দিনগুলোতে। আসাদ ও মতিউরের রক্তধারা যদি রাজপথকে রঞ্জিত না করত, তবে বাঙালির মুক্তি সংকল্প হয়তো আরও দীর্ঘকাল অবরুদ্ধ থাকত।

২০ জানুয়ারি ১৯৬৯। ঢাকা মেডিকেলের সামনে আসাদের বুক লক্ষ্য করে পুলিশের ছোড়া গুলিটি কেবল একজন ছাত্রের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং আইয়ুব শাহীর পতন পরোয়ানায় সিলমোহর মেরে দিয়েছিল। আসাদ ছিলেন প্রতীক—একটি বঞ্চিত জাতির ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি। যখন তাঁর রক্তভেজা শার্টটি মিছিলে পতাকার মতো ওড়ানো হলো, তখন বাঙালির জাতীয়তাবাদ তার পূর্ণ অবয়ব খুঁজে পায়। কবি শামসুর রাহমান যথার্থই লিখেছিলেন, সেটি ছিল আমাদের প্রাণের পতাকা। ওই মুহূর্ত থেকেই বাঙালি মানসিকভাবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

আসাদের শাহাদাতের রেশ কাটতে না কাটতেই ২৪ জানুয়ারি রাজপথ কাঁপিয়ে আসে কিশোর মতিউর। নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির ছাত্র মাত্র ১৫ বছর বয়সী মতিউরের এই অসামান্য আত্মদান প্রমাণ করেছিল যে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কেবল রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের ছোট সন্তানদের মনেও। মতিউরের রক্তই '৬৯-এর আন্দোলনকে একটি সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়। এই গণজাগরণের চাপে লৌহমানব আইয়ুব খান নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং কারামুক্ত হন বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার বাতিঘর শেখ মুজিবুর রহমান।

৬৯ থেকে ৭১: অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র

কেন আমরা ৬৯-কে মুক্তিযুদ্ধের 'প্রবেশদ্বার' বলব? তার কারণগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট:

নেতৃত্বের উত্থান: ৬৯-এর আন্দোলনের ফসল হিসেবেই শেখ মুজিবুর রহমান 'বঙ্গবন্ধু' হয়ে ওঠেন এবং জাতীয় ঐক্যের মূর্ত প্রতীক হন।

নির্বাচনী ম্যান্ডেট: এই অভ্যুত্থানই ৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পথ প্রশস্ত করে, যা ছিল স্বাধীনতার মূল আইনগত ভিত্তি।

প্রতিরোধের সংস্কৃতি: ৬৯ শিখিয়েছিল কীভাবে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে হয়। এই ভয়হীন মানসিকতাই একাত্তরে সাধারণ মানুষকে গেরিলা যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, আসাদ আর মতিউরের রক্ত বৃথা যায়নি। তাঁদের রক্তের পথ ধরেই এসেছিল ৭০-এর নির্বাচন, ৭১-এর অসহযোগ এবং পরিশেষে মহান মুক্তিযুদ্ধ। আজ ৫৭ বছর (২০২৬ সাল অনুযায়ী) পরও আসাদের শার্ট আর মতিউরের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই স্বাধীনতা কোনো দান নয়, বরং এটি অনেক ত্যাগের বিনিময়ে কেনা এক অমূল্য সম্পদ। ৬৯-এর সেই উত্তাল দিনগুলোই আমাদের একাত্তরের মোহনায় পৌঁছে দিয়েছিল—যেখানে স্বাধীনতার সূর্য প্রথম উদিত হয়েছিল।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।