স্টাফ রিপোর্টার : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা প্রকল্পে যেসব অযাচিত এবং অপরিণামদর্শী ব্যয় করেছে, তার একটি সামগ্রিক প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন। 

রবিবার (২৫ জানুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, বিভিন্ন অযাচিত এবং অপরিণামদর্শী যে প্রকল্পগুলোর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে-তার একটি সামগ্রিক রিফ্লেকশন এসেছে আমাদের নিত্যপণ্যের বাজারে। সেটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই।

পদ্মা সেতুতে অযাচিত ব্যয়ের কারণে দেশে চালের দাম বেড়েছে-উপদেষ্টার এমন একটি মন্তব্যের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় হয়। সে বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ২০০৮ সালে যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন, তখন আন্তর্জাতিক দেনা ছিল ২ লাখ কোটি টাকা। সেটা এ বছর এসে উপনীত হয়েছে ২৩ লাখ কোটি টাকার ওপরে। এই যে সামগ্রিক দায়, এর জন্য আমাদের টাকার যে মূল্যমান কমেছে, সেটা ৪৬ ভাগ।

আমাদের বিনিয়োগ হতে হবে, ব্যয়ের উদ্বৃত্ত তৈরি করতে হবে। আমরা ঋণভিত্তিক যে ব্যয়গুলো করেছি, তা আমাদের আয়ের উদ্বৃত্ত তৈরি করতে পারেনি।

তিনি বলেন, এর ফলে আমাদের টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন রকমের দীর্ঘমেয়াদি দায় তৈরি হয়েছে।
যে কারণে আমাদের আইএমএফ-এর কাছ থেকেও টাকা নিতে হয়েছে। বিগত আওয়ামী সরকার ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণের সাহায্য নিয়েছিল। এই সামগ্রিকতার বিচারে শুধু পদ্মা সেতুই নয়, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেলসেতু করা হয়েছে, পায়রা বন্দর করা হয়েছে। এই পায়রা বন্দরে, যে জায়গায় মাত্র ৪ মিটার গভীর, সেটা পোর্ট না ঘাট-সেটাও চিন্তার বিষয়।

উপদেষ্টা বলেন, যেখানে পদ্মা রেল সেতুতে প্রাক্কলন ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, সেখান থেকে টোল উঠছে মাত্র ২৬ কোটি টাকা। তো এই ব্যয়ের টাকা আপনি পাবেন কোথায়? আর তাছাড়া আমাদের যে কথা বলা হয়েছিল, পদ্মা সেতু হলে আমাদের জিডিপি ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে-উল্টো আমাদের জিডিপি কমে এসেছে। আপনি বিশ্লেষণ নিজে করেই দেখুন, এর বিনিময়ে আপনি কী পেয়েছেন।

শেখ বশিরউদ্দিন বলেন, ব্যয়গুলো যদি আমরা ইরিগেশনে করতে পারতাম, যদি আমরা আমাদের লোকাল ফার্টিলাইজার প্রোডাকশনে করতে পারতাম। আমরা কত লক্ষ কোটি টাকার সার বিদেশ থেকে কিনে নিয়ে আসি। সুতরাং এই ব্যয়কে যদি আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের কস্ট অফসেট বা ব্যয়ের উদ্বৃত্ত তৈরি করার জন্য বিনিয়োগ করতে পারতাম, তাহলে অবশ্যই আমাদের সক্ষমতা বাড়ত এবং জাতীয় সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের লোন কমত এবং লোন পরিশোধের সক্ষমতাও বাড়ত।

গত দেড় বছরে আপনার সরকার বা আপনি যে মন্ত্রণালয়ে ছিলেন, আপনাদের উদ্যোগগুলো এখান থেকে বের হওয়ার জন্য ছিল-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই ছিল। আমরা আমাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাদ দিয়েছি, বাতিল করেছি, যেখানে ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব ছিল। আজকেও একনেকে পাট মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প গেছে ফোর্থ টাইম এক্সটেনশন করে, কিন্তু এই ফোর্থ টাইম এক্সটেনশন হয়েছে, কস্ট কমেছে। রূপপুরে বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা, কারণ কারেন্সি ডিভ্যালুয়েশন। এই কথাটাই তো আমি আপনাকে বলছি-টাকার যে অবমূল্যায়ন ঘটেছে, এই অবমূল্যায়নের জন্য একটি প্রকল্পে ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে।

গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার-এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, না, কথাটা আপনি সরলভাবে যদি দেখেন। এটা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। আইএমএফ-এর লোন বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। কারণ আপনার অর্থনৈতিক বাস্তবতা যদি আপনি আজ অস্বীকার করেন-যখন দেশের সমস্ত ব্যাংকিং সিস্টেম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক সাগর পরিমাণ চুরি হয়েছে-শ্বেতপত্রে কি আপনারা সেটা দেখেননি? আপনি কি সেটাকে সুবিধাজনকভাবে ভুলে যাচ্ছেন?

তিনি বলেন, আপনি যদি মনে করেন ওই অবস্থার ক্ষত পূরণ না করে চলা যেত, তাহলে আপনার যে পরিমাণ লোনের দরকার ছিল, সেটা ছাড়া তো উপায় ছিল না। অনেক প্রকল্প আছে, যেখানে ৮০ শতাংশ টাকা খরচ হয়ে গেছে কিন্তু প্রকল্পের প্রয়োজন নেই-এগুলো কি করবেন, বন্ধ করে দেবেন? যেগুলো ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ হয়েছে, সেগুলো বন্ধ করা হয়েছে। যেগুলো ৭০-৮০ শতাংশ হয়ে গেছে, সেগুলো কী করবেন?

আগের সরকার ছিল-এই ১১ মাসে যে পরিমাণ দেশি-বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, বছর হিসেবে তা আগের সরকারের চেয়ে বেশি-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনি মনে হয় আমার আগের কথাটা শোনেননি। আমি বলেছি, এটা একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম। আইএমএফ-এর লোন এই সরকার নেওয়া শুরু করেনি। এটা বিগত সরকারের আলোচনার বিষয়। যে অর্থনৈতিক পাহাড়সম সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেটার ক্ষয়পূরণের উদ্দেশ্যেই এই লোন নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আপনার যদি কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ইমব্যালেন্স, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ইমব্যালেন্স থাকত-তা নিয়ে কি আপনি অর্থনীতি চালাতে পারতেন? আজকে কি আপনার প্লেটে খাবার থাকত?

আপনারা যদি লোন নিয়েই পরিশ্রম করেন-আগে কত সারেন-তাহলে আপনাদের ক্রেডিট আসলে কী, আপনার রাজস্ব কতটুকু বাড়ালেন-এই প্রশ্নগুলো অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টার কাছে করলে ভালো হয়। আমি আপনাকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে বলছি। পদ্মা ব্রিজ নিয়ে সব বলতে চাই, কিন্তু আমার মনে হয় এখন উদ্দেশ্য যদি রমজান হয়, তাহলে রমজানের মধ্যে নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ে প্রশ্নই হওয়া উচিত।

এ সময় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলোর প্রতিনিধি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন।

(ওএস/এএস/জানুয়ারি ২৬, ২০২৬)