রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা সদরের আখড়াখোলা গ্রামের প্লে শ্রেণীর পড়ুয়া সেহজাদ হোসেন রিয়ানকে অপহরণের পর নির্যাতন করে হত্যার পর লাশ পানিতে ফেলে গুম করার চেষ্টার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত রবিবার রাতে তার বাবা সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আখড়াখোলা গ্রামের শাহাদাৎ হোসেন বাদি হয়ে কারো নাম উল্লেখ না করে সদর থানায় এ মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান অব্যহত রেখেছে।

হেমায়েতপুর আল নাসির ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আখড়াখোলা গ্রামের মোঃ শাহাদাৎ হোসেন জানান, তার ছেলে সেহজাদ হোসেন রিয়ান (৬) আখড়াখোলা আলহ্বাজ্ব সোয়েব হোসেন প্রিক্যাডেট স্কুলে প্লে শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। সে কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধি ও চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। গত শুক্রবার সকালে সে তার মায়ের সাথে মুকুন্দপুর গ্রামের নানা মতিয়ার রহমানের বাড়িতে আসে। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে নানার বাড়ি থেকে বের হয়। কিছুক্ষণ পর তাকে না পেয়ে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে স্বজনরা বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে। রাতেই তিনি তার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় ১৪৪২ নং সাধারণ ডায়েরী করেন। রবিবার সকালে তার শ্যালক মেহেদী হাসানের মাছের ঘের থেকে ছেলে রিয়ানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ছেলের ঠোঁটে ও বুকে কিছু কালো রক্তজমা দাগ দেখা যায়। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে মংনা তদন্ত শেষে রবিবার বিকেলে রিয়ানের লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নিহত রিয়ানের মামা মুকুন্দপুর গ্রামের সজীব হোসেন জানান, চঞ্চল প্রকৃতির রিয়ান মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে বের হয়ে দোকানে খাবার কিনতে যেতো। বৃহষ্পতিবার দুপুর একটার দিকে রাজনগর বাজারের আগে আরিজুলের মুদি দোকানের সামনে পৌঁছে কান্না শুরু করে। ওই রাস্তা দিয়ে আসার সময় তাদেরই এক আত্মীয় রিয়ানকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়। শুক্রবার বিকেলে তাদের (মামা) বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর এক ব্যক্তি তাকে বাইসাইকেলে করে রাজনগর বাজারের দিকে নিয়ে যায় মর্মে রানা’র ফ্লক্সি লোড, সার ও কীটনাশক দোকানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে দেখা যায়। ধেড়েখালি স্লুইজ গেটের পাশে দুজন একটি কালো রং এর মটর সাইকেলে বসানোর একপর্যায়ে রিয়ান কান্নাকাটি শুরু করে মর্মে স্থানীয় জিয়ারুলের স্ত্রী নূরনাহার তাদেরকে অবহিত করেন। পরে রিয়ানকে এগারোআনি মজনু মাষ্টারের পাশে নিয়ে রাখা হয়। তখন সে আম্মু যাব, আম্মু যাব বলে কান্নাকাটি শুরু করলে মটর সাইকেলের পিছনে থাকা ব্যক্তি রিয়ানকে একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে দেওয়ার জন্য চালককে বলেন। ধারনা করা হচ্ছে রিয়ানকে এলাকার বাইরে না নিয়ে যেতে পেরে নির্যাতনের পর হত্যা করে লশি গুমের জন্য শনিবার রাতেই মামা মেহেদী হাসানের মাছের ঘেরে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা।

তবে রিয়ানের নানা ও মামাসহ স্বজনরা জানান, মতিয়ার রহমানের পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ৫ আগষ্টের পর জেলা পরিষদের সদস্য লাল্টুর বাড়ি আগুন দিয়ে জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়। গত বছরের ২৭ জুন গোলাম মোস্তফার বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি হয়। মতিয়ার রহমানের সদস্যদের কাছে প্রতিনিয়ত চাঁদা দাবি করতো একটি মহল। তাছাড়া দুই বছর আগে আখড়াখোলা বাজারের পাশে শাহাদাৎ হোসেনকে জমি কিনতে বাধা দেয় এক ব্যক্তি। এরপরও শাহাদাৎ হোসেন জমি কেনেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ করার কারণে গত ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর এলাকারই একটি মহল মতিয়ার রহমানের ছেলেদের উপর কুদৃষ্টি ছিল। এরমধ্যে এলাকার একজন মাদক ব্যবসায়িও রিয়ান হত্যাকা-ে জড়িত থাকতে পারে। মুক্তিপণের দাবিতে রিয়ানকে অপহরণ করা হলেও দ্রুত মাইকিং করা, স্বজন ও প্রশাসনের তৎপরতার কারণে রিয়ানকে এলাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া বা মুক্তিপণ দাবি করা সম্ভব হয়নি।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ রাহুল সাহা জানান, ময়না তদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া এই মুহুর্তে রিয়ানের মৃত্যুর কারণ বলা সম্ভব নয়।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা সাতক্ষীরা সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক সুকান্ত ঘোষ জানান, রিয়ানকে হত্যার পর লাশ গুম করার চেষ্টার ঘটনায় তার বাবা শাহাদাৎ হোসেন বাদি হয়ে কারো নাম উল্লেখ না করে রবিবার রাতে থানায় একটি মামলা (৩৭ নং) দায়ের করেছেন। উন্নত টেকনোলজি ব্যবহার করে হত্যার রহস্য উন্নোচন ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা করছে পুলিশ।

(আরকে/এসপি/জানুয়ারি ২৬, ২০২৬)