রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : জমির লীজের টাকা না পাওয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করায় লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় আদালতের নির্দেশে থানায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের ব্যবসায়ি নাসিরউদ্দিন গাজী বাদি হয়ে একই গ্রামের ব্যবসায়ী নূর আমিন গাজীসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ১২ জনের বিরুদ্ধে গত বুধবার সাতক্ষীরা ৭ নম্বর আমলী আদালতে এ মামলা দায়ের করেন। 

মামলার আসামিরা হলেন- দেবহাটার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের কোরবান গাজীর ছেলে পারুলিয়া বাজারের আমিন ফিস এর স্বত্বাধিকারী নূর আমিন গাজী, একই গ্রামের সবেদ আলী সানার ছেলে রফিকুল সানা, গোলাম মোস্তফার ছেলে রাজিব হোসেন ও শাকিল হোসেন এবং শওকত হোসেনের ছেলে ভেদো।

মামলা ও ঘটনার বিবরনে জানা যায়, দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের কোরবান গাজীর ছেলে পারুলিয়া বাজারের “আমিন ফিস” এর স্বত্বাধিকারী নূর আমিন একই গ্রামের নাসিরউদ্দিন গাজীর বাবা দিদারবক্স গাজীর কাছ থেকে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দুটি চুক্তিপত্রের বিনিময়ে বিঘা প্রতি ১৩ হাজার টাকা হারিতে ৫৪ বিঘা জমি নয় বছর মেয়াদী লীজ নেন। হারী বাবদ নূর আমিন কিছু টাকা দিলেও ৩৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেননি নূর আমিন। ২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল নাসিরউদ্দিনের বাবা ও ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি তার মা মারা যান। এরপর থেকে নূর আমিনের কাছে টাকা চাইতে গেলে তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হতো। টাকা না পাওয়ার বিষয়টি স্থানীয় পারুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ও গোলাম ফারুক বাবু, জিন্নাত সরদারসহ বিভিন্ন সুশীল সমাজের মানুষকে অবহিত করা হয়। এতেও কোন সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তিনি পাওনা ৩৫ লাখ টাকা পাওয়ার জন্য ২০২৪ সালের প্রথম দিকে উপজেলা চেয়ারম্যান আল ফেরদৌস আলফা ও ১২ ডিসেম্বর দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ করেও কোন ফল পাননি। একপর্যায়ে একই এলাকার বাসারতকে নিয়ে তিনি নূর আমিনের হ্যাচারীতে গেলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন নূর আমিন। এরই ধারাবাহিকতায় গতবছরের ১৭ নভেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে তাকে তার পারুলিয়া বাসস্টা- এলাকার সিঙ্গার মেশিন কোম্পানীর দোকানের সামনে থেকে বিনা অপরাধে পুলিশ দিয়ে থানায় তুলে নিয়ে যেয়ে পরদিন একটি বিচারাধীন মামলায় চালান দেওয়া হয়। এটা নূর আমিনের পরিকল্পনা বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মামলা ও ঘটনার বিবরনে আরো জানা যায়, জামিন মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবারো জমির লীজ পাওয়ার দাবিতে বিভিন্ন স্থানে দেনদরবার শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে নূর আমিনের বিরুদ্ধে হারির টাকার দাবিতে অভিযোগ করেন। মেয়াদ শেষে ৩১ ডিসেম্বর তার ঘেরের জমি মুক্ত করে না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারি তিনি দেবহাটা থানায় অভিযোগ করেন নূর আমিনের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানতে পেরে নূর আমিন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে গত ৫ জানুয়ারি সোমবার রাত ১১ টার দিকে ছেলে আবু রায়হানকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সততা হোটেলে সবজি কিনে বের হওয়া মাত্রই নূর আমিনের নির্দেশে তার আত্মীয় দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের সবেদ আলী সানার ছেলে রফিকুল সানা, মোস্তফার ছেলে (রফিকুলের জামাতা) রাজীব, ভাই সাকিল, নূর আমিনের ভাগ্নে ভেদোসহ ১৫/২০ জন তাকে টেনে হিঁচড়ে খালের পাশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

এক পর্যায়ে তাকে রফিকুল, সজীব, সাকিল, ভেদোসহ কয়েকজন লোহার রড দিয়ে এলোপাতড়ি পিটিয়ে জখম করে। ছেলে আবু রায়হান হামলাকারিদের হাতে পায়ে জড়িয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। ছেলের সহায়তার বাড়ি যেয়ে ৯৯৯ এ ফোন করলে দেবহাটা থানার উপপরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুমের নেতৃত্বে পুলিশ এসে নাসিরউদ্দিনকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এ ঘটনায় নাসিরউদ্দিন গাজী বাদি হয়ে গত ১৪ জানুয়ারি সাতক্ষীরার ৭ নম্বর আমলী আদালতে (সিআর-১১/২৫ দেবহাটা) নূর আমিনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। বিচারক নুসরত জাহান মামলাটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দোবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ জাকির হোসেন জানান, আদালতের নির্দেশ পেয়ে মামলাটি এজাহার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আসামীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

(আরকে/এসপি/জানুয়ারি ২৬, ২০২৬)