প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, কুড়িগ্রাম : তিস্তা ও ধরলা নদীর বিধৌত উপজেলা কুড়িগ্রামের রাজারহাট। রাজারহাট, ফুলবাড়ী ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ২৬ কুড়িগ্রাম- ২। এক সময়ের জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল কুড়িগ্রাম- ২ আসন। গত দুই দশকে এ আসনে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে পালাবদলের রাজনীতি হয়েছে। এবারে আসনটিতে লড়াই করছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে সোহেল হোসনাইন কায়াকোবাদ, এনসিপির শাপলা কলি প্রতীকে ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ, জাপার লাঙ্গল প্রতীকে পনির উদ্দিন আহমেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা নুর বখত হাতপাখা প্রতীকে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে পারেনি। তাই কুড়িগ্রাম-২ আসনেও আওয়ালীগ প্রার্থী নেই। কিন্তু জাতীয় পার্টি এ নির্বাচনে অংশ গ্রহন করায় কুড়িগ্রাম-২আসনে পনির উদ্দিন আহমেদ লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে তিনি পাড়া-মহল্লায় প্রচার-প্রচারনা চালাচ্ছেন। সেই সাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মনোনিত প্রার্থী সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অনেক আগ থেকেই মাঠ পর্যায়ে চষে বেরাচ্ছেন। মিছিল-মিটিং থেকে শুরু করে ধর্মিয় সভায়ও অংশ গ্রহন করে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনি জনসাধারণের কাছে প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছেন। এ আসনটিতে জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা মাঠ গুছিয়েন। কিন্তু হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন হাতপাকা প্রতীক নিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেন।

অপরদিকে জামায়াত এ আসনে প্রার্থী না দিয়ে দশ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) রংপুর বিভাগের সাংগনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহবায়ক ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ (আতিক মোজাহিদ) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নামেন। এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে জাপা। তবে হাল ছাড়তে নারাজ বিএনপি ও জামায়াত।

১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কুড়িগ্রাম- ২ রাজারহাট, ফুলবাড়ী ও কুড়িগ্রাম সদর সংসদীয় আসন হাতছাড়া করেনি জাপা। বিপুলসংখ্যক ভোটব্যাংক থাকায় দলটির প্রার্থীর বিপরীতে সুবিধা করতে পারেনি বিএনপি ও জামায়াত। এ আসনটি জাপার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

তথ্যমতে, কুড়িগ্রাম-২আসনের এমপি তাজুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন রংপুর-১৪ আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৬ সালের তৃতীয়, ১৯৮৮ সালের চতুর্থ, ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১২ জুন ১৯৯৬ সালের সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। ২০১০ সালের ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদের ২৬ ও কুড়িগ্রাম ২২ আসনে স্বাধীনতার পর আওয়ামীলীগ নৌকা প্রতীকে মো. জাফর আলী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসনটি কেড়ে নেন।

২০১৮ সালের ১৩ আগষ্ট জাতীয় পার্টির চিফ হুইপ এমপি তাজুল ইসলাম মারা গেলে উপ-নির্বাচনে পূনরায় এ আসনটি জাপা ফিরে পান। এমপি হন জাপার পনির উদ্দিন আহমেদ। ২০২৪সালে দ্বাদশ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. হামিদুল হক খন্দকার এ আসনটি জাপা থেকে কেড়ে নেন। এ আসনে বিএনপি -জামায়াত দীর্ঘ ৪০বছর ধরে কাজ করলেও আসনটি ছিল জাপার দখলে। ২০২৪ এর শেষের দিকে বিএনপির একটি অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে কৌশলে কাজ করে জাপা থেকে আসনটি কেড়ে নেয়। আওয়ামীলীগ না থাকায় এবারে ধানের শীষের জোয়ার দেখা যায় আসনটিতে। সে কৌশল অবলম্বন করেই এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপির প্রার্থী সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ ও নেতারা। এখন পর্যন্ত আসনটিতে বিএনপি অনেকাংশে এগিয়ে রয়েছে বলে ভোট জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম- ২ আসনে বিএনপি- এনসিপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি ভোট যুদ্ধ লেগেছে। যেহেতু এ আসনটি জামায়াত এনসিপিকে ছেড়ে দিয়েছে। সে কারণে জামায়াত এনসিপিকে মাঠ থেকে তুলে নিয়ে আসার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও জামায়াত শাপলা কলি প্রতীকে ভোট চাচ্ছে। মাঠ ধরে রাখার জন্য দুই পক্ষেই মর্যাদার লড়াই চলছে। শেষ পর্যন্ত এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে বিএনপি ও এনসিপি জোটের মধ্যে আক্রমনাত্মক লড়াই হলে মাঝখানে জাপা আবারও ফায়দা লুটতে পারে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

(পিএস/এসপি/জানুয়ারি ২৭, ২০২৬)