কুষ্ঠ চিকিৎসা: লজ্জা নয়, সাহস প্রয়োজন
ওয়াজেদুর রহমান কনক
কুষ্ঠ দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবনের জন্য কুষ্ঠকে কেবল একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের রোগ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। একে বুঝতে হলে ইতিহাস, সমাজ, নৈতিকতা ও মানবাধিকার—এই চারটি পরিসরের সম্মিলিত সংকট হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস মূলত সেই মানবিক উপলব্ধির প্রতিফলন, যেখানে রোগের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের মর্যাদা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং ন্যায়বোধ। কুষ্ঠ বা হ্যানসেন রোগ আজও বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত মানুষের এক কঠিন বাস্তবতা হিসেবে বিদ্যমান, যদিও আধুনিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এখনও প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার থেকে এক লাখ আশি হাজার নতুন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়। এই রোগ প্রায় দুই শতাধিক দেশে রিপোর্ট করা হলেও বাস্তবে এটি একশ বিশটিরও বেশি দেশে স্থায়ীভাবে বিদ্যমান। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী নতুন শনাক্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় চল্লিশ শতাংশ নারী এবং প্রায় পাঁচ শতাংশের বেশি শিশু, যা স্পষ্ট করে যে কুষ্ঠ কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং সামাজিক পরিবেশ, দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যসেবার অসম প্রবেশাধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি নতুন কেস শনাক্ত হচ্ছে, যেখানে দারিদ্র্য, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগ নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০০০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করেছিল যে প্রতি দশ হাজার জনে একটির কম কুষ্ঠ রোগীর হার অর্জিত হওয়ায় কুষ্ঠ আর বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে গণ্য নয়। তবে এই ঘোষণা বাস্তবতার পুরো চিত্র তুলে ধরে না। সংক্রমণের হার কমলেও রোগ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি এবং বহু দেশে এটি নীরবে টিকে আছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসা পাওয়া সত্ত্বেও অনেক রোগী সামাজিক পুনর্বাসন, মানবিক স্বীকৃতি ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পান না। অনেক দেশে রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় কুষ্ঠ আরও বেশি গোপন থাকে, সামাজিক বর্জন তীব্র হয় এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাপী নতুন কুষ্ঠ রোগীর প্রায় আশি শতাংশ মাত্র তিনটি দেশে—ভারত, ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ায়—কেন্দ্রিত। এই দেশগুলোতে দারিদ্র্য, ঘনবসতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কুষ্ঠ সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলেই সর্বাধিক রোগী শনাক্ত হয়; শুধু ২০২৩ সালেই এ অঞ্চলে এক লাখ ত্রিশ হাজারের বেশি নতুন কুষ্ঠ রোগী নথিভুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও কুষ্ঠ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। যদিও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উদ্যোগের ফলে অনেক দেশ প্রায় কুষ্ঠমুক্ত অবস্থায় পৌঁছেছে, বাংলাদেশে এখনও প্রতিবছর প্রায় চার হাজার নতুন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় আট শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়, যা প্রমাণ করে যে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা না পেলে কুষ্ঠ একজন মানুষের জীবনকে কতটা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই পরিসংখ্যানগুলোর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে কুষ্ঠ কেবল একটি চিকিৎসাগত সমস্যা নয়। এটি একটি সামাজিক রোগ, যা কুসংস্কার, ভয়, অজ্ঞতা ও বৈষম্যের মাধ্যমে ব্যক্তিগত কষ্টকে সমষ্টিগত সংকটে রূপ দেয়। আধুনিক চিকিৎসা কার্যকর হলেও, যদি রোগী আশ্রয়, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে রোগের ক্ষত শুধু শরীরে নয়—সমাজের ভেতরেও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এই বাস্তবতা থেকেই কুষ্ঠ দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কুষ্ঠকে শুধু একটি রোগ হিসেবে নয়, বরং মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়, পুনর্বাসন ও মানবাধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখতে শেখানোই এই দিবসের মূল বার্তা। কুষ্ঠ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো মানে কেবল সংক্রমণ কমানো নয়; বরং রোগীদের জীবনমান উন্নয়ন, সমাজে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা—যা একা চিকিৎসাব্যবস্থার পক্ষে সম্ভব নয়।
অতএব, কুষ্ঠ দিবস আমাদের সার্বজনীনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই রোগ আজও বহু মানুষকে নীরবে আড়াল করে রাখছে। সামাজিক বর্জনের কারণে অনেক রোগী চিকিৎসার বাইরে একটি কঠিন জীবন সংগ্রামে আটকে পড়ে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন শুধু ওষুধ নয়; প্রয়োজন সমাজের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা, কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতি এবং ভয়কে জ্ঞান ও সহানুভূতিতে রূপান্তর করার দৃঢ় অঙ্গীকার। তবেই কুষ্ঠকে কেবল একটি রোগ হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষের জীবন ও মর্যাদার গল্প হিসেবে দেখা সম্ভব হবে।
কুষ্ঠ রোগ বিষয়ে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক গবেষণা দেখায় যে রোগটির চিকিৎসা শুধু ওষুধের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং রোগ শনাক্তের সময়কাল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে কুষ্ঠ শনাক্ত করা গেলে প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, সামাজিক ভয় ও লজ্জার কারণে বহু রোগী গড়ে দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করেন। এই বিলম্বই কুষ্ঠকে একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ থেকে আজীবন সামাজিক বোঝায় রূপান্তরিত করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য হলো—কুষ্ঠ রোগের সংক্রমণক্ষমতা অত্যন্ত কম। দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ ছাড়া সাধারণ সামাজিক মেলামেশায় এই রোগ ছড়ায় না। তবু বহু দেশে কুষ্ঠাক্রান্ত মানুষকে আলাদা করে রাখা, কর্মক্ষেত্র থেকে বাদ দেওয়া কিংবা পরিবারে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা এখনও বিদ্যমান। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, কুষ্ঠ–সম্পর্কিত বৈষম্যমূলক আইন বা সামাজিক রীতি এখনও ২০ টিরও বেশি দেশে কোনো না কোনোভাবে কার্যকর।
এই বাস্তবতায় কুষ্ঠ দিবসের তাৎপর্য আরও বিস্তৃত হয়। এটি রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে কুষ্ঠ নির্মূলের লড়াই কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়; এটি শিক্ষা, আইন, সমাজকল্যাণ ও মানবাধিকার নীতির সমন্বিত প্রয়াসের দাবি রাখে। কুষ্ঠ বিষয়ে সাহসী স্বীকারোক্তি, সময়মতো চিকিৎসা এবং সমাজের ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতাই পারে এই রোগকে সত্যিকার অর্থে ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ করে দিতে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
