ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন
ওয়াজেদুর রহমান কনক
ডিজিটাল সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য আধুনিক সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও শক্তিশালী সম্পদে পরিণত হয়েছে। মানুষের পরিচয়, আচরণ, মতামত, স্বাস্থ্য, আর্থিক লেনদেন ও সামাজিক সম্পর্ক আজ ডেটা হিসেবে সংরক্ষিত ও বিশ্লেষিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার গুরুত্ব কেবল প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবাধিকার, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ব্যক্তিগত তথ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংকোচন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অ্যালগরিদমভিত্তিক ব্যবস্থাপনা মানুষের আচরণ পূর্বানুমান ও প্রভাবিত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে তথ্য সুরক্ষা না থাকলে নাগরিক সহজেই নজরদারি, প্রোফাইলিং এবং মতাদর্শগত নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিকে দুর্বল করে এবং ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্যে অসমতা সৃষ্টি করে।
সাইবার নিরাপত্তা তথ্য সুরক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ। তথ্য যত বেশি ডিজিটাল অবকাঠামোর উপর নির্ভরশীল হয়, তত বেশি তা হ্যাকিং, পরিচয় চুরি ও অর্থনৈতিক অপরাধের ঝুঁকিতে পড়ে। প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও নাগরিক সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই তথ্য সুরক্ষা একটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
আইন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আধুনিক রাষ্ট্রের নৈতিক সক্ষমতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তথ্য ব্যবহারের স্বচ্ছতা, সম্মতির নিশ্চয়তা এবং অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার না থাকলে ডিজিটাল উন্নয়ন মানবিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা তাই কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রয়োজন নয়, বরং মানবিক মর্যাদা রক্ষার মৌলিক শর্ত।
২৮ জানুয়ারি পালিত ডেটা প্রাইভেসি দিবস (Data Privacy Day) কেবল একটি প্রতীকী আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি ডিজিটাল সভ্যতার নৈতিক ভিত্তি, আইনি কাঠামো এবং ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তথ্যকে ঘিরে আধুনিক সমাজ যে অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা প্রশ্নটি ব্যক্তিগত অধিকার ছাড়িয়ে রাষ্ট্র, করপোরেশন এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার সম্পর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
ডিজিটাল যুগে তথ্য আর নিছক উপাত্ত নয়; এটি অর্থনৈতিক সম্পদ, রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম মাধ্যম। ব্যক্তির পরিচয়, আচরণ, পছন্দ, বিশ্বাস, স্বাস্থ্য, চলাচল এমনকি আবেগ পর্যন্ত আজ ডেটা হিসেবে সংগৃহীত, সংরক্ষিত ও বিশ্লেষিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ডেটা প্রাইভেসি বলতে শুধু তথ্য গোপন রাখার অধিকার বোঝানো হয় না; বরং বোঝানো হয় তথ্যের উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ, সম্মতি প্রদানের ক্ষমতা এবং অপব্যবহার থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা। মিশেল ফুকোর “প্যানঅপটিকন” ধারণা আজ ডিজিটাল বাস্তবতায় নতুন রূপ পেয়েছে, যেখানে নজরদারি আর দৃশ্যমান নয়, বরং অ্যালগরিদম ও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নীরবে কার্যকর।
ডেটা প্রাইভেসির ধারণাগত ভিত্তি গড়ে উঠেছে মানবাধিকারের দর্শন থেকে। ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার সনদের একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে এই অধিকার ক্রমশ শর্তসাপেক্ষ হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল অ্যাপসমূহ ব্যবহারকারীর আচরণভিত্তিক বিশাল ডেটা সংগ্রহ করে, যা পরবর্তীতে বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক প্রচারণা এমনকি জনমত নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহৃত হয়। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি এই বাস্তবতার একটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত উদাহরণ, যা দেখিয়ে দিয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা ডেটা প্রাইভেসির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তথ্য যত বেশি ডিজিটাল হয়, তত বেশি তা হ্যাকিং, ফিশিং, র্যানসমওয়্যার ও রাষ্ট্রীয় সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। সাইবার নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা, আইনগত কাঠামো এবং নাগরিক সচেতনতার সম্মিলিত ফল। উন্নত এনক্রিপশন, নিরাপদ সার্ভার বা ফায়ারওয়াল থাকলেও যদি ব্যবহারকারী নিজের তথ্য ব্যবহারের ঝুঁকি না বোঝে, তবে নিরাপত্তা ভঙ্গ অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই ডেটা প্রাইভেসি দিবসের মূল তাৎপর্য প্রযুক্তি নয়, বরং সচেতন নাগরিক গড়ে তোলা।
আইনি পরিসরে ডেটা প্রাইভেসি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (GDPR) ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড স্থাপন করেছে, যেখানে সম্মতি, তথ্য ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং “রাইট টু বি ফরগটেন” ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন ও প্রয়োগ কাঠামো দুর্বল, ফলে নাগরিকরা প্রায়ই করপোরেট ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির মুখে অসহায় অবস্থানে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ডেটা প্রাইভেসি একটি আইনি প্রশ্নের পাশাপাশি নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় ডেটা প্রাইভেসি আরও জটিল। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্ল্যাটফর্মে জমা হচ্ছে। কিন্তু তথ্য ব্যবহারের স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা এখনো পর্যাপ্তভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে ডেটা লিক, পরিচয় চুরি এবং ডিজিটাল হয়রানির ঝুঁকি বাড়ছে। ডেটা প্রাইভেসি দিবস এই বাস্তবতায় একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে—ডিজিটাল উন্নয়ন কি মানবিক নিরাপত্তাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিচ্ছে?
ডেটা প্রাইভেসি দিবসের চূড়ান্ত তাৎপর্য ভবিষ্যৎ ডিজিটাল সমাজের দিকনির্দেশনায় নিহিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা ও বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির যুগে ব্যক্তিগত তথ্যের সীমা কোথায় নির্ধারিত হবে—এই প্রশ্নের উত্তর আজই খোঁজা না হলে ভবিষ্যতে স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার ধারণা মৌলিকভাবে বদলে যেতে পারে। তাই এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি মানুষের জন্য—মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয়। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল প্রযুক্তিবিদ বা নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব নয়; এটি সচেতন নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অনুশীলন।
ডিজিটাল সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য আধুনিক সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও শক্তিশালী সম্পদে পরিণত হয়েছে। মানুষের পরিচয়, আচরণ, মতামত, স্বাস্থ্য, আর্থিক লেনদেন ও সামাজিক সম্পর্ক আজ ডেটা হিসেবে সংরক্ষিত ও বিশ্লেষিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার গুরুত্ব কেবল প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবাধিকার, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ব্যক্তিগত তথ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে ব্যক্তিস্বাধীনতার সংকোচন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অ্যালগরিদমভিত্তিক ব্যবস্থাপনা মানুষের আচরণ পূর্বানুমান ও প্রভাবিত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে তথ্য সুরক্ষা না থাকলে নাগরিক সহজেই নজরদারি, প্রোফাইলিং এবং মতাদর্শগত নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিকে দুর্বল করে এবং ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্যে অসমতা সৃষ্টি করে।
সাইবার নিরাপত্তা তথ্য সুরক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ। তথ্য যত বেশি ডিজিটাল অবকাঠামোর উপর নির্ভরশীল হয়, তত বেশি তা হ্যাকিং, পরিচয় চুরি ও অর্থনৈতিক অপরাধের ঝুঁকিতে পড়ে। প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও নাগরিক সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই তথ্য সুরক্ষা একটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
আইন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আধুনিক রাষ্ট্রের নৈতিক সক্ষমতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তথ্য ব্যবহারের স্বচ্ছতা, সম্মতির নিশ্চয়তা এবং অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার না থাকলে ডিজিটাল উন্নয়ন মানবিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা তাই কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রয়োজন নয়, বরং মানবিক মর্যাদা রক্ষার মৌলিক শর্ত।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
