স্টাফ রিপোর্টার : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যালোচনা ও মতামতের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালার (২০২৬-২০৩০) খসড়া প্রকাশ করেছে। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) তথ্য অধিদপ্তরের এক বিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিবরণীতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিরাপদ, নৈতিক এবং উদ্ভাবন-কেন্দ্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এই নীতিমালার ওপর মতামত প্রদানের সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে। নাগরিক, সংশ্লিষ্ট শিল্প স্টেকহোল্ডার, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ এবং সকল আগ্রহী পক্ষকে এই খসড়া নীতিমালার ওপর তাদের মতামত জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

তথ্য বিবরণীতে আরও বলা হয়, জাতীয় এআই নীতিমালা বাংলাদেশের ডিজিটাল নীতিমালার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি মৌলিক পরিবর্তন নির্দেশ করে। পূর্বের এআই নীতিটি ছিল মূলত সেবামুখী। নতুন কাঠামোটি দায়িত্বশীল এআই উন্নয়ন ও প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তিগত চাহিদাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

এআই নীতিমালাটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাম্প্রতিক জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যকর করার উদ্যোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই ভিত্তিগত পদক্ষেপগুলো নিরাপদ ও ন্যায়সংগত এআই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রদান করে।

এই নীতিমালায় জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ কে কাজে লাগিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে নিরাপদ উপাত্ত আদান-প্রদান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে এতে নাগরিকদের গোপনীয়তা রক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উপাত্ত সম্পদের ওপর ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এতে মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে অপরিহার্য এবং অনস্বীকার্য মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

এর আওতায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এআই সিস্টেমের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ‘অ্যালগরিদমিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (প্রভাব যাচাইয়ের ব্যবস্থা)’ ও বৈষম্য রোধে সুনির্দিষ্ট সুরক্ষার বিধান রাখা হয়েছে।

নীতিমালায় একটি স্তরীভূত বা ধাপভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে, যা সোশ্যাল স্কোরিং (সামাজিক মূল্যায়ন) ও গণনজরদারির মতো অগ্রহণযোগ্য এআই ব্যবহারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। একইসাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং জনসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেম ব্যবহারে যথাযোগ্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।

এই নীতিমালায় ডিপফেক, এআই-সৃষ্ট গুজব বা অপতথ্য, প্রযুক্তির মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও শিশুদের শোষণের মতো অপরাধ মোকাবিলায় ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে এই নীতিমালায় একটি ‘এআই ইনোভেশন ফান্ড’ গঠন ও নিরাপদ পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য ‘রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স’ তৈরির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া একটি দক্ষ ও এআই-বান্ধব জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমে এআই শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একটি নৈতিক ও উদ্ভাবনী এআই পরিবেশ গড়ে তোলার রূপকল্প তুলে ধরা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ডিজিটাল ট্রান্সফর্মেশন এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে জনসেবার আধুনিকায়ন, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এআই ব্যবহারের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এই নীতিমালা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক এআই শাসন কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। এর মধ্যে রয়েছে ওইসিডি এআই নীতিমালা, ইউনেস্কোর এআই এথিক্স সুপারিশ, কাউন্সিল অব ইউরোপ এআই ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন ও আসিয়ান এআই গাইডেন্স। এটি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক এআই উন্নয়নে একটি দায়িত্বশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং জ্ঞান বিনিময় ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সহজতর করবে।

জনগণের মতামত কাঠামোটি পরিমার্জন করতে ও এটি যেন সকল বাংলাদেশির চাহিদা, মূল্যবোধ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

(ওএস/এএস/জানুয়ারি ২৯, ২০২৬)