শিতাংশু গুহ


বাংলাদেশে আর একটি নির্বাচন এসে গেছে। নির্বাচন মানে প্রহসন। নির্বাচন মানে হিন্দু’র ওপর সহিংসতা। নির্বাচন মানে কিছু প্রাণহানি। তবু নির্বাচনে কিছু লোক এমপি হ’ন, দুর্নীতি করেন, দেশের কথা কারো মনে থাকেনা। নেতারা গরিবের জন্যে কাজ করতে করতে কোটিপতি হয়ে যান, গরিব আরো গরিব হয়ে পড়ে? তবু তো নির্বাচন, একটি গণতান্ত্রিক ধাপ, হোক না সেটা ‘মেটিক্যুলাস’ কারচুপি’র নির্বাচন। শেখ হাসিনা’র আমলে পরপর ৩টি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো, এবারের নির্বাচনটিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ভোটার যাকেই ভোট দিক, জিতবে তালগাছ। আওয়ামী লীগ ভোট প্রতিহত করতে চাচ্ছে, কিন্তু করবে কে? নির্বাচনটি হয়ে গেলে আওয়ামী লীগ কি করবে? নির্বাচন না হলেই বা কি করবে? নির্বাচনটি কি আসলেই হবে? হবে, তবে মেটিক্যুলাস পদ্ধতিতে। সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে গেছে। শুধু ঘোষণা বাকি! 

সময় আছে মাত্র দুই সপ্তাহ’র একটু বেশি। ফরিদপুর থেকে একজন ফোন করে জানালো, কিসের নির্বাচন, তেমন সাড়াশব্দ তো দেখি না? নির্বাচন নিয়ে মানুষের সংশয় আছে, এর কারণ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার অভাব। ধারণা করি, নির্বাচনটি যেনতেন প্রকারে হয়ে যাবে। যারা আগে বলতেন নির্বাচন হবেনা, তারা এখন বলছেন, নির্বাচনটি হলেও সরকার টিকবে না? আমরা গত ১৭মাস ধরে শুনছি, ইউনুস সরকার টিকবে না! টিকে তো আছে? তেমনি নির্বাচনটি হয়ে গেলে যেই সরকারই আসুক, নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হোক বা না-হোক, সরকারটি হবে নির্বাচিত সরকার, সুতরাং সেটি ফেলে দেয়া অতটা সহজ হবেনা। ইউনুস সরকার ছিলো ভঙ্গুর, সেটিই যখন ফেলা গেলোনা তখন একটি নির্বাচিত সরকার ফেলা অতটা সহজ নাও হতে পারে।

তাহলে কি বাংলাদেশ এভাবেই চলবে? হ্যাঁ, তবে রাজনৈতিক সরকার হয়তো কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। পাঠক কি হতাশ হচ্ছেন? বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর অনেকেই দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো, কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র বাহিনী ছিলো, ছিলেন রাজনৈতিক নেতারা। তখনো প্রায়শ:শোনা যেত যে, জিয়া সরকার পড়ে যাচ্ছে। শেষমেশ সবাইকে চোরের মতোই দেশে ফিরতে হয়েছিলো। এবারো হয়তো তাই ঘটবে। অর্থাৎ আন্দোলনটা দেশে বসেই করতে হবে। বাংলাদেশের হিন্দুরা গত ৭৯ বছর ধরে আশা করেছিলো যে, ভারত তাদের উদ্ধার করবে, করেনি। আওয়ামী লীগাররা ভারতের দিকে চেয়ে থাকলেও ভারত তেমন কিছু করবে এমন আভাষ কোথায়? সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটলে এবং তা নিরাপত্তার জন্যে হুমকি হলে ভারত কিছু করতে পারে?

ভারত একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক দেশ, ইচ্ছে করলেই ভারত সবকিছু করতে পারেনা। এটি ঠিক ভারত সরকার, ও ভারতের জনগণ আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীল শক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল। ভারত সরকার কখনোই শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে না। আমি একজন ভারতীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে আমেরিকা এতকিছু করছে, আপনারা কিছু করছেন না কেন? তিনি বলেছেন, আমেরিকার মত ভারতের পক্ষে কি সবকিছু করা সম্ভব? সুতরাং আওয়ামী লীগারদের সবকিছু নুতন করে ভাবতে হবে, নুতন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে? যারা এখন ক্ষমতায় তাঁরা সরে যাবার জন্যে আসেনি। নির্বাচন দিয়ে হোক বা না দিয়ে হোক, তাঁরা বা তাদের বন্ধুরা ক্ষমতায় থাকবে। দেশ গোল্লায় গেলে তাদের কিচ্ছু আসে-যায় না? তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে পূর্ব-পাকিস্তান বানানো।

এ সময়ে ভোটের রাজনীতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নির্বাচনী প্রচার শুধু ধর্ম, স্বৈরাচার ও ভারত বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ। আওয়ামী লীগ মাঠে নাই, তাই বিএনপি-জামাত ফাইট কিছুটা দৃশ্যমান। জামাতের শরিক লেবার পার্টির এক নেতা তোষামোদ করে বলেই ফেলেছেন, ডা. শফিকুর রহমানে মধ্যে জনতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি বা মাহাথির মোহাম্মদকে দেখেছে। তাহলেই বুঝুন, ১৭ মাসে দেশের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা, খোমেনীরা ক্ষমতায় এলে কি হবে? জামাতের আর এক নেতা ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির ভোটকে ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, দাঁড়িপাল্লাকে জয়ী করা প্রত্যেক মুসলিমের নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। তিনি বলেন, ভোটের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব এবং কিয়ামতের দিনে নিজেকে জবাবদিহি করতে পারবেন। নারীঘটিত অপকর্মে গ্রেফতার হওয়া খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকও এবার রাজনীতির মাঠে আছেন।

জামাতের এক হিন্দু প্রার্থী বলেছেন, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে ডিমের কুসুমের মত আলগে রাখবো। মনে আছে নিশ্চয় জাতীয় পার্টির এমপি সেলিম ওসমান শিক্ষক শ্যামল ভক্তকে কানধরে উঠবস করিয়েছিলেন! আওয়ামী লীগ আমলে সেলিম ওসমান ভাল তবিয়তে ছিলেন, তবে শ্যামল ভক্ত পরে বাধ্য হয়েছিলেন গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে সেলিম ওসমানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালাতে। নির্বাচনকালীন সময়ে বাংলাদেশের হিন্দুদের অসহায়ত্ব এ দু’টি ঘটনায় স্পষ্ট। এবারেও একই চিত্র, হিন্দুরা ভোট দিলেও সমস্যা, না দিলেও সমস্যা। এমনিতে চিন্ময় প্রভু’র মুক্তি না দিলে অনেকেই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পক্ষে নয়? আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও বিপদে আছে, তারা কাকে ভোট দেবেন? নাকি ভোট বয়কট করবেন। এ সময়ে জাতীয় পার্টি, এবি পার্টি বা এমনকি বিএনপি মিনমিন করে আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলছে, লক্ষ্য আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পাওয়া।

সাবেক ভিপি নূর-র জেতার সম্ভবনা কম, তাই তিনি এখন আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলছেন, যদি লাইগ্যা যায়? ঠাকুরগাঁয়ে বিএনপি’র মহাসচিব আওয়ামী লীগের জন্যে দুয়ার খুলে দিচ্ছেন, কারণ সেখানে প্রচুর হিন্দু ভোট। জামাতের শক্ত প্রার্থী। ২০২৪–আগষ্টের পর ঠাকুগাঁয়ের হিন্দু মন্ত্রীকে বিএনপি যেভাবে নির্যাতন করে জেলে দিয়েছে, প্রতিপক্ষ সেটি হিন্দুদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তারেক রহমান, তিনি যতই ভাষণ দিচ্ছেন মনে হচ্ছে বিএনপি’র ভোট কমছে। ভাষণে এত আল্লাবিল্লাহ করলে কি ভোট বাড়বে? এজন্যে তো জামাত আছে। আওয়ামী লীগও একই ভুল করেছিল, মৌলবাদের খেদমতে কর্মীদের ভুলে গিয়েছিলো, সুযোগ মত মৌলবাদ বাঁশ দিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতা নাই, আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতা সৃষ্টি হতে দেয়নি। এনসিপি’র রাজনীতি পুরোটাই ভুল, সুবিধাবাদী, ধর্মকে সুড়সুড়ি দেয়া, এবং ভারত বিরোধিতা। নির্বাচনী মাঠে এদের পদচারণা দৃশ্যমান নয়, এঁরা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে অভ্যস্থ, হয়তো থাকবেও।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।