‘ইরানের বিপ্লবী গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করলো ইইউ’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বিষয়টি নিয়ে ইইউ সদস্যদের মধ্যে বহুদিনের বিভাজন থাকলেও, বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয় জোটটি।
ইইউয়ের এই সিদ্ধান্ত সম্ভব হয়েছে ফ্রান্স তাদের দীর্ঘদিনের আপত্তি তুলে নেওয়ার পর। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো এক্সে লিখেছেন, ইরানি জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের বিরুদ্ধে অসহনীয় দমন আর উত্তরহীন থাকতে পারে না।
ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ আশঙ্কা করেছিল, আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করলে কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ও ইরানে থাকা তাদের নাগরিকদের স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বেলজিয়ামও একই উদ্বেগে ছিল, তবে দেশটির সরকার গত বছর ইইউ তালিকাভুক্তিকে সমর্থন জানায়। বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভট বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর নৃশংসতা দেখে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে।
তবে এ সিদ্ধান্তকে ‘বড় কৌশলগত ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্স-এ লেখেন, এ মুহূর্তে বহু দেশ সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইউরোপ বরং আগুনে ঘি ঢালছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত আইআরজিসি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি আনুগত্যশীল একটি অভিজাত প্যারামিলিটারি বাহিনী। পৃথক নৌ ও বিমান বাহিনীসহ এর স্থলবাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার।
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে, কানাডা ২০২৪ সালে ও অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
ইইউয়ের সিদ্ধান্তে এখন চাপ বাড়ছে যুক্তরাজ্যের ওপর, যারা এখনো আইআরজিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করেনি, তবে ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ইইউয়ের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। এটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ইরানি কর্তৃপক্ষের সহিংসতা ও বর্বরতার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আইআরজিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী ঘোষণা করা মূলত প্রতীকী হবে, কারণ যুক্তরাজ্যে সংস্থাটি সম্পদ জব্দসহ নানা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
ইইউয়ের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এক বিবৃতিতে বলেন, আইআরজিসি ইরানের বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যে সরকার নিজের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে, তা নিজ পতনের দিকেই এগিয়ে যায়।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলের প্রধান হান্নাহ নয়মান বলেন, আইআরজিসিকে তালিকাভুক্ত করা হলো ‘অনেক দিনের দেরিতে দেওয়া রাজনৈতিক বার্তা’, যা দেখায়, সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক দমন আর উত্তরহীন থাকবে না।
তিনি আরও জানান, এই তালিকাভুক্তি কেবল প্রতীকী নয়, এর সুস্পষ্ট আইনি প্রভাব রয়েছে। সম্পদ জব্দ করা হবে, আর যেকোনো আর্থিক বা উপকরণ সহায়তা এখন থেকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ইইউ আরও ১৫ জন ইরানি সরকারি কর্মকর্তা ও ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে, বিক্ষোভ দমনে ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে’ ভূমিকার কারণে। নিষেধাজ্ঞায় যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন, ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসকান্দার মোমেনি, আইআরজিসির কয়েকজন কমান্ডার, পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ইরানের অডিও-ভিজ্যুয়াল মিডিয়া রেগুলেটরি অথরিটি ও বিভিন্ন সফটওয়্যার কোম্পানি, যারা সেন্সরশিপ, ট্রলিং, ভুয়া তথ্য ছড়ানো ও ইন্টারনেট বিঘ্নিত করার কাজে যুক্ত ছিল।
সর্বশেষ সংযোজনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ইইউ এখন পর্যন্ত ২৪৭ জন ব্যক্তি ও ৫০টি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। এছাড়া ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ অভিযানে সহযোগিতাকারী ইরানি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর পৃথকভাবে সম্পদ জব্দ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকায় যুক্ত করার এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন সময়ে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা না হলে সামরিক হামলা হতে পারে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে জানান, একটি ‘বৃহৎ নৌবহর’ ইরানের দিকে যাচ্ছে যা প্রয়োজন হলে ‘গতি ও সহিংসতা’ নিয়ে মিশন সম্পন্ন করবে।
অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই সপ্তাহে ইরান ইস্যুতে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এই মাসের শুরুতে গালফ দেশগুলোর সংযমের আহ্বান ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রতিশোধের প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে ট্রাম্প সামরিক হামলা থেকে সরে এসেছিলেন।
এদিকে, রাশিয়া বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সতর্ক করে বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনো সামরিক পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, বলপ্রয়োগ শুধু বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ভয়ংকর প্রভাব ফেলবে।
তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
(ওএস/এএস/জানুয়ারি ৩০, ২০২৬)
