রাজপথের প্রজাতন্ত্র: ক্রান্তিকালে পথশিশুদের নীরব আর্তনাদ
মো: ইমাদুল হক সোহাগ
২০২৬ সালের জানুয়ারির এক শীতল সকালে ঢাকার কারওয়ান বাজার, কমলাপুর রেলস্টেশন কিংবা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের দিকে তাকালে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা কেবল দারিদ্র্যের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। রাজপথে ছড়িয়ে থাকা অগণিত শিশু—কেউ ঘুমন্ত, কেউ ভিক্ষারত, কেউবা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত—আমাদের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’, ‘সংস্কার’ ও ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ’-এর বয়ানকে নীরবে কিন্তু গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ যখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে নতুন নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে, তখন ঢাকার রাজপথে বেড়ে ওঠা এই বিপুল সংখ্যক পথশিশু রাষ্ট্রীয় সংস্কার আলোচনার প্রায় বাইরে থেকেই যাচ্ছে। অথচ, এই জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে সেই সংস্কারের টেকসই ভিত্তি।
বিদ্যমান পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের গবেষণা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ঢাকার পথশিশু সংকট এখন আর কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার কাঠামোগত দুর্বলতার সম্মিলিত ফল। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৫–২০২২ সময়কালের বিভিন্ন জরিপে বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ৬ থেকে ১০ লাখের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, যার একটি বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক বন্যা, নদীভাঙন ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ফলে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১৫ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে—যদিও এর কোনো চূড়ান্ত সরকারি শুমারি এখনও হয়নি।
বিশেষত ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা—ফেনী, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙন—লক্ষাধিক পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে ঢাকার বস্তি, ফুটপাত ও রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়। ২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে আমরা যে পথশিশুদের দেখি, তাদের একটি বড় অংশই এই জলবায়ু-উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান—যারা এখন ফুল বিক্রি, হকারি, ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অপরাধচক্রের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত।
ইউনিসেফ ও দেশীয় গবেষণা সংস্থাগুলোর একাধিক সমীক্ষা ইঙ্গিত দেয়, পথশিশুরা সহিংসতা ও নির্যাতনের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। অধিকাংশ পথশিশু নিয়মিতভাবে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হয় এবং একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খোলা আকাশের নিচে—রাস্তায়, পার্কে কিংবা স্টেশনে—রাত্রিযাপন করতে বাধ্য হয়। এসব পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; এটি একটি জাতির সমষ্টিগত বিবেকের ওপর নেমে আসা নৈতিক দায়ের প্রতিফলন।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এখানে মূলত দ্বিমুখী। প্রথমত, নীতিগত অসারতা; দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। শিশু আইন ২০১৩, যা একসময় জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের (সিআরসি) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি অগ্রসর আইন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে আজ গভীর সংকটে। আইনের আওতায় থাকা ‘নিরাপদ হেফাজত’ (সেফ কাস্টডি) ব্যবস্থা বহু ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিবর্তে কার্যত একধরনের বন্দিত্বে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বহুগুণ বেশি শিশু রাখা হয়, যেখানে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশের ন্যূনতম মানদণ্ডও নিশ্চিত হয় না। বড় অপরাধে অভিযুক্ত কিশোরদের সঙ্গে সাধারণ পথশিশুদের একত্রে রাখার ফলে পুনর্বাসনের পরিবর্তে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ে।
এই রাষ্ট্রীয় অদক্ষতার সুযোগেই ঢাকার রাজপথে গড়ে উঠেছে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি—ভিক্ষাবৃত্তি ও শিশুশ্রমকেন্দ্রিক অপরাধচক্র। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল, মাজার ও জনাকীর্ণ এলাকাগুলো সংগঠিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকে। পথশিশুদের দৈনিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ এসব সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিতে বাধ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় তদন্তে শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো অমানবিক চর্চার কথাও উঠে এসেছে, যাতে জনসাধারণের সহানুভূতি সহজে আদায় করা যায়। এমনকি শিশু ‘ভাড়া’ দেওয়ার একটি অবৈধ বাজারের অস্তিত্বও চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে শিশুদের দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে ব্যবহৃত হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাম বা আঠা-নির্ভর নেশার ভয়াবহ বিস্তার। হার্ডওয়্যারের দোকানে সহজলভ্য আঠা বা সলিউশন অতি অল্প মূল্যে পাওয়া যায়, যা পলিথিনে ভরে নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে শিশুরা ক্ষুধা, শীত ও মানসিক যন্ত্রণা সাময়িকভাবে ভুলে থাকার চেষ্টা করে। চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এই নেশা শিশুদের স্নায়বিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রায় অপরিবর্তনীয় ক্ষতি করে। অপরাধচক্রগুলো এই আসক্তিকেই নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
একই সঙ্গে এটিও স্বীকার করা প্রয়োজন যে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে শিশু অধিকার বিষয়ে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল কণ্ঠস্বরও রয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, এনডিসি মহোদয় শিশুদের অধিকার, সুরক্ষা ও পুনর্বাসন ইস্যুতে ব্যক্তিগতভাবে যে নীতিগত দৃঢ়তা ও প্রশাসনিক সচেতনতা প্রদর্শন করে আসছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তাঁর নেতৃত্বে প্রশাসনের ভেতরে যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধ প্রতিফলিত হচ্ছে, তা প্রমাণ করে—যথাযথ সমন্বয় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে পথশিশু সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব।
২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি তাই কেবল মানবিক নয়, গভীরভাবে রাজনৈতিক: আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়তে চাই? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার আলোচনায় বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, রাজপথে বেড়ে ওঠা এই বিপুল সংখ্যক শিশুর ভবিষ্যৎ সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। অথচ, এই শিশুরা যদি মানবসম্পদে রূপান্তরিত না হয়ে অপরাধচক্রের স্থায়ী হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে কোনো সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
সমাধান কেবল পুলিশি অভিযান বা উচ্ছেদমূলক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ‘লিডো’ (লিডো) কিংবা ‘এক রঙের এক ঘুড়ি’-র মতো বেসরকারি সংস্থাগুলো দেখিয়েছে, শিশুবান্ধব পরিবেশ, ভালোবাসা ও ধারাবাহিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পথশিশুদের শিক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবিকায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাদের ‘পিস হোম’ কিংবা ‘স্কুল আন্ডার দ্য স্কাই’ মডেলগুলো প্রমাণ করে—কারাগার নয়, বরং উন্মুক্ত ও নিরাপদ সামাজিক পরিসরই শিশুর প্রকৃত বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে।
অতএব, রাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে শিশু আইনের প্রয়োগ কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করা, ‘সেফ কাস্টডি’-র নামে শিশুদের বন্দিত্ব বন্ধ করা এবং বিশ্বাসযোগ্য এনজিওগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নীতি গ্রহণ করা। একই সঙ্গে ভিক্ষাবৃত্তি ও শিশুশ্রম সিন্ডিকেটের পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
২০২৬ সাল ঢাকার পথশিশুদের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হতে পারে—যদি রাষ্ট্র এই রাজপথের ‘অদৃশ্য প্রজাতন্ত্র’-কে আর উপেক্ষা না করে। অন্যথায়, এই অবহেলা একদিন বুমেরাং হয়ে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করবে।
লেখক: ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও উদ্যোক্তা।
