ব্যাংক খাতের অস্থিরতা প্রশমনে শাস্তি নয়, পুরস্কার
চৌধুরী আবদুল হান্নান
“তাছাড়া ব্যাংকের নজিরবিহীন বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীগণ এবং পরিচালনা পরিষদ কিন্ত কর্মচারীরা নন। বিনা দোষে তাদের ওপর আর্থিকভাবে শাস্তি আরোপ করা হলে তা হবে যে কোনো বিবেচনায় ন্যায় বিচারের পরিপন্থী।”
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাত এখন আর আইসিইউতে নেই, কেবিনে উঠে এসেছে। শুভ লক্ষণ, এ খাতটি ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সংস্কারের নামে যত কাজই হোক না কেনো, রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গেরই দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করা যায় না, কেবল ব্যতিক্রম ব্যাংকিং খাত।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থ উপদেষ্টাকে বেপরোয়া ঋণ খেলাপিদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য আর রাজনৈতিক অযাচিত বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হয়নি।
সফলতার পাশাপাশি তাঁদের ব্যর্থতাও রয়েছে, দিশেহারা নেতার মতো গভর্নরের প্রথমদিকের এক অপেশাদার বক্তব্যে ব্যাংক পাড়ায় নতুন করে বিশ্বাস ও আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছিল।
তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার পথে, কিছু কিছু ব্যাংকের বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, এক সঙ্গে টাকা তুলতে যাবেন না, তা হলে পাবেন না।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অভিভাবকের এমন দায়িত্বহীন বক্তব্যে চরম অস্থিরতা তৈরী হয়েছিল এবং আমানতকারীরা টাকা তুলতে এক সাথে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।
আমানতকারীদের দোষ কোথায়?
একটু লাভের আশায় তিল তিল করে ব্যাংকে সঞ্চয় করা অর্থ যে কোনো সময় চাহিদা মতো পেতে যখন অনিশ্চয়তা দেখা দেয় তখন কারও মাথা গরম না হয়েই পারে না। আমানতকারীদের সাথে ব্যাংক বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে, প্রতারণা করেছে। পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া আবর্জনা দূর করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে কম খেচারত দিতে হয়নি। বাজার ব্যবস্হায় নেতিবাচক কী প্রভাব পড়বে তা বিবেচনা না করেই সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংককে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আপতকালীন তারল্য সহায়তা দিয়ে ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ব্যাংক খাতের ধস সামলাতে হাজার হাজার কোটি টাকার নোট ছাপাতে হয়েছে।
তবে অবশেষে আশার কথা, নানা পদক্ষেপ নেওয়ায় ব্যাংকিং খাতের অবস্থা উন্নতির দিকে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যেদিন বললেন—একীভূত হওয়া কোনো ব্যাংকের কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা হবে না এবং কোনো গ্রাহক আমানত হারাবেন না, সেদিন থেকেই ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস দ্রুত ফিরে আসা শুরু করেছে। বুদ্ধিদীপ্ত ইতিবাচক কথার সব সময় সুফল পাওয়া যায়।
প্রকৃতপক্ষে কথাই সব, চিকিৎসক যদি রোগী দেখে প্রথমেই বলেন - এ বড় কঠিন রোগ! রোগীর অবস্হা তখন কেমন হবে?
নতুন একীভূত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মচারীদের বর্তমান বেতন থেকে শতকরা ২০ ভাগ কমানো ও বিদ্যমান অন্যান্য সুবিধা কাটছাট করার ঘোষণা আসছে বলে জানা গেছে। ব্যাংকটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর আগেই ব্যাংক কর্মীদের জন্য এমন হতাশার বার্তা তাদের মনোবল, উৎসাহ কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারিদের বেতন আড়াই গুণ করার সুপারিশ করেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। প্রশ্ন তো থেকেই যায়, বেসরকারী চাকরিজীবী আর সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বাজার কি আলাদা?
সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এমন বৈষম্য সৃষ্টি করা সুবিবেচনা প্রসূত পদক্ষের বলা যায় না। তাছাড়া ব্যাংকের নজিরবিহীন বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীগণ এবং পরিচালনা পরিষদ কিন্ত কর্মচারীরা নন। বিনা দোষে তাদের ওপর আর্থিকভাবে শাস্তি আরোপ করা হলে তা হবে যে কোনো বিবেচনায় ন্যায় বিচারের পরিপন্থি। এতে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরী হবে এবং অন্যদিকে টাকা ফেরত না পাওয়া আমানতকারীদের মিলিত বিক্ষোভ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে কিনা, তাও ভাবার বিষয়।
তাদের ব্যর্থতার নজির ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের উদ্বোধনের জন্য ২৫ জানুয়ারী দিন ধার্য ছিল, মাত্র একদিন আগে নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাতিল করে দেয়।
গভর্নর ও অর্থ উপদেষ্টা জরুরি বৈঠক করে নিরাপত্তাজনিত চরম ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
আগে থেকেই ব্যাংক কর্মচারী ও বিক্ষুব্ধ আমানতকারীদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল, কোনো কর্মসূচী ঘোষণা করার আগেই কর্তৃপক্ষ পিছপা হলো। নিজেদের সক্ষমতা বিবেচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় বিপর্যয় অনিবার্য।
এ ব্যাংক নিয়ে কিছু ব্যক্তি ও মহল ভুল তথ্য ছড়িয়ে গন্ডগোলের পায়তারা করছে এবং পরিকল্পিত গুজব চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। গুজব মোকাবিলা করে, সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে আগাতে হবে, হতাশা প্রকাশ করার অর্থ ভেঙে পড়া।
নতুন কোনো উদ্যোগ কার্জকর করতে গেলে, নানা প্রতিবন্ধকতা থাকেই এবং সেগুলো উত্তোরণের দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সে কারণেই মেধা ও যোগ্যতা যাচাই করে ম্যানেজার বা প্রশাসক নিয়োগ দিতে হয়। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে আর যাতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক খাতের অবস্হা ইতিমধ্যে উন্নতির দিকে, এখন আর কোনো নেতিবাচক পদক্ষেপ নয়, কেবল ইতিবাচক ভাবনাই জরুরি। ব্যাংকের অবস্থার পরিবর্তন সাপেক্ষে কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতির আশ্বাস, খেলাপি বা অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ে নগদ প্রণোদনা ঘোষণা, বিশেষ কোনো অবদান রাখার জন্য বাড়তি ইনক্রিমেন্ট বা বোনাস ব্যবস্থা এবং গতানুগতিক কাজের বাইরে যে কোনো ভালো কাজের জন্য পুরস্কার দিতে হবে।
পুরস্কার কেবলই অর্থ দিয়ে দিতে হবে, তা নয়; অনেক সময় কর্তৃপক্ষের একটি প্রশংসাপত্রই বড় পুরস্কার। এভাবে হতোদ্যম কর্মকর্তা/কর্মচারীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে, তাদের কর্ম উদ্দীপনা ও মনোবল বৃদ্ধি পাবে এবং ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরী হবে।
নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কতটা মেধা ও দক্ষতার সাথে পরিচালনা করার সক্ষমতা রাখেন তার ওপর।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম, সোনালী ব্যাক।
