ওয়াজেদুর রহমান কনক


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নীলফামারী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম ও নীলফামারী সদর উপজেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেলিড্রপ ও রাপ্লিং মহড়া কেবল একটি সামরিক কৌশলগত অনুশীলন নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা দর্শন, বেসামরিক–সামরিক সমন্বয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুরক্ষার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের বহুমাত্রিক প্রতিফলন। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই মহড়ার মূল উদ্দেশ্য দৃশ্যমান শক্তি প্রদর্শনের চেয়েও বেশি—এটি সম্ভাব্য অদৃশ্য সংকট মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলন।

নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক অধ্যায়। বাংলাদেশের মতো জনবহুল, ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় এবং রাজনৈতিকভাবে আবেগপ্রবণ সমাজে নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, আকস্মিক সহিংসতা কিংবা যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মতো চ্যালেঞ্জ সবসময়ই বিদ্যমান। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাহিনী মোতায়েনের সক্ষমতা রাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ। হেলিড্রপ ও রাপ্লিং মহড়ার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে—যদি কোনো ভোটকেন্দ্র বা নির্বাচনী এলাকায় স্বল্প সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে প্রচলিত সড়কপথের ওপর নির্ভর না করে আকাশপথে প্রশিক্ষিত প্যারা কমান্ডো মোতায়েনের মাধ্যমে কীভাবে দ্রুত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

এই মহড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরোধমূলক মনস্তত্ত্ব বা ডিটারেন্স সাইকোলজি সৃষ্টি। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা অনেক সময় এই ধারণা থেকে জন্ম নেয় যে রাষ্ট্র দ্রুত বা কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। সেনাবাহিনীর এ ধরনের মহড়া সেই ধারণাকে ভেঙে দেয় এবং একটি নীরব কিন্তু সুস্পষ্ট বার্তা দেয়—রাষ্ট্র প্রস্তুত, সক্ষম এবং প্রয়োজনে সর্বোচ্চ পেশাদার দক্ষতা প্রয়োগে দ্বিধাহীন। ফলে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলাকারী শক্তির মধ্যে একটি মানসিক বাধা সৃষ্টি হয়, যা বাস্তব ক্ষেত্রেও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

সামরিক পেশাদারিত্বের দিক থেকেও এই মহড়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্যারা কমান্ডোদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তাকে সেনাবাহিনী কোনো সাধারণ রুটিন দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং একটি বিশেষায়িত অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে। হেলিকপ্টার থেকে অবতরণ, সীমিত সময়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ, বেসামরিক জনগণের মাঝে দায়িত্ব পালন এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়—এসব কার্যক্রম অত্যন্ত উচ্চমাত্রার প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দাবি করে। এই মহড়ার মাধ্যমে সেই সক্ষমতাগুলো বাস্তব পরিবেশে যাচাই ও পরিমার্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

গভীরতর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই মহড়া বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক ভূমিকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। সেনাবাহিনী এখানে কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নয়; বরং অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার সহায়ক শক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। রংপুর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কামরুল হাসানের নির্দেশনায় আয়োজিত এই মহড়া রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাই প্রতিফলিত করে। কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও অবস্থান থেকে স্পষ্ট—গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে রাষ্ট্র নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এই উপলব্ধি থেকেই সেনাবাহিনী তাদের দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর।

এই মহড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। যদিও তাঁদের নাম, পদবি বা নির্দিষ্ট ইউনিট আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তথাপি এতে ব্রিগেডিয়ার, কর্নেল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যায়ের অপারেশন ও প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের সংশ্লিষ্ট ইউনিট কমান্ডার এবং প্যারা কমান্ডো ইউনিটের দায়িত্বশীল সিনিয়র অফিসারদের উপস্থিতি ছিল বলে জানা গেছে। তাঁদের সম্মিলিত তত্ত্বাবধান মহড়াটিকে আরও কার্যকর ও অর্থবহ করে তোলে।

মহড়া চলাকালে নীলফামারী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম ও সদর উপজেলা প্রাঙ্গণের আশপাশে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও বাহবা এই উদ্যোগের সামাজিক গুরুত্বও স্পষ্ট করে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখনও জনগণের কাছে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। নির্বাচনকালীন সময়ে এই জনআস্থাই সবচেয়ে বড় সামাজিক পুঁজি, যা আতঙ্ক কমিয়ে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করে।

সবশেষে বলা যায়, নীলফামারীতে অনুষ্ঠিত হেলিড্রপ ও রাপ্লিং মহড়া প্রতীকী ও বাস্তব—উভয় অর্থেই একটি অত্যন্ত কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। এটি একদিকে রাষ্ট্রের দৃঢ়তা, প্রস্তুতি ও নিরপেক্ষতার ঘোষণা, অন্যদিকে জরুরি মুহূর্তে জীবন, সম্পদ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় সক্ষম একটি পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল রিহার্সাল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের হেলিড্রপ ও রাপ্লিং মহড়া শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা প্রস্তুতির অংশ নয়; এটি নির্বাচনকালীন ‘র্যাপিড রেসপন্স ফ্রেমওয়ার্ক’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো কমান্ড, কন্ট্রোল, কমিউনিকেশন ও কো-অর্ডিনেশন—এই চারটি স্তম্ভকে একত্রে কার্যকর রাখা। মহড়ার মাধ্যমে সেনাবাহিনী বাস্তব পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টার ব্যবস্থাপনা, গ্রাউন্ড টিমের দ্রুত সংগঠিত হওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের সক্ষমতা যাচাই করেছে, যা সংকট মোকাবেলায় সময় ও ক্ষয়ক্ষতি উভয়ই কমাতে সহায়ক।

নির্বাচন কমিশন ও বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর এই সমন্বিত প্রস্তুতি নির্বাচনী নিরাপত্তাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। কারণ, যেকোনো নির্বাচনে শুধু বাহিনীর উপস্থিতিই নয়, বরং তাদের নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা ও আইনি কাঠামোর প্রতি আনুগত্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই মহড়া সেই বার্তাই দেয় যে সেনাবাহিনী আইন ও সংবিধানের সীমারেখার মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত।

এ ছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের মহড়া আয়োজনের ফলে মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। তারা বুঝতে পারে, প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা আসবে। ফলে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং সামগ্রিকভাবে একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আরও দৃঢ় হয়।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।