নির্বাচন ঘিরে ক্ষুদ্র অর্থনীতির উত্থান
স্টাফ রিপোর্টার : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচার স্বল্পমেয়াদে দেশের স্থানীয় অর্থনীতিতে দৃশ্যমান গতি আনলেও এর সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে পৌঁছায়নি। জনসভা, মিছিল ও নির্বাচনি প্রচার ঘিরে চা-নাশতার দোকান, মাইক সার্ভিস, পরিবহন ও হোটেল খাত বাড়তি আয়ের সুযোগ পেলেও নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের কারণে কাগজকল, ছাপাখানা ও পোস্টারনির্ভর শিল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট এ ক্ষুদ্র অর্থনীতি একদিকে যেমন কিছু খাতকে সাময়িকভাবে চাঙা করছে, অন্যদিকে নীতিনির্ধারণী সীমাবদ্ধতায় বেশ কয়েকটি শিল্প খাতকে বঞ্চিত করছে। একই সঙ্গে দৃশ্যমান ব্যয় কমলেও অঘোষিত ও অদৃশ্য নির্বাচনি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর জনসভাকে কেন্দ্র করে ভোর থেকেই মাঠে ভিড় করেন হাজারো সমর্থক। তাদের আগমন ঘিরে পানি, চা, মুড়ি, বিস্কুট ও স্থানীয় খাবারের দোকানগুলোতে দেখা যায় বাড়তি ব্যস্ততা। এ চিত্র সংসদ নির্বাচনের আগে দুই সপ্তাহজুড়ে সারা দেশেই দেখা গেছে। রাস্তায় ঝুলছে ব্যানার, লাউড স্পিকার লাগানো রিকশা মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ছন্দময় সুরে প্রচারিত হচ্ছে নির্বাচনি বার্তা।
প্রায় ৫০টি রাজনৈতিক দলের প্রায় ২ হাজার প্রার্থী নির্বাচনি লড়াইয়ে নামায় প্রচারের এ সময়টুকু নিজেই এক ধরনের ক্ষুদ্র অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, নির্বাচনি মৌসুমে চা, বিস্কুট ও মুড়ির মতো দ্রুত বিক্রয়যোগ্য পণ্যের চাহিদা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক এলাকায় মাইক সার্ভিসের ভাড়া দ্বিগুণ হয়েছে এবং বেশির ভাগ সরঞ্জাম আগেই বুকড হয়ে গেছে।
মানিকগঞ্জের মাইক ভাড়ার ব্যবসা করেন মমিন উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রার্থীদের চাহিদা মেটাতে আমাকে জেলার ছোট ছোট মাইক সার্ভিস থেকে লাউডস্পিকার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। নির্বাচন মৌসুমে তার মাইকের ভাড়া দিনে ১ হাজার টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রতি প্রার্থী প্রতিদিন একটি সাউন্ড সিস্টেমের জন্য গড়ে ৩ হাজার টাকা ব্যয় করছেন, যার মধ্যে মাইক, মোটরচালিত রিকশা ও ঘোষকের খরচ অন্তর্ভুক্ত।
চায়ের দোকানিরাও নির্বাচনের উত্তাপ ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন। ফরিদপুরের চা বিক্রেতা রেজাউল করিম জানান, তার দৈনিক বিক্রি ৪-৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ কেজি চা খাওয়া হয়। শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনের সময় চায়ের চাহিদা সাধারণত ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। উৎপাদনকারীরা বলেন, প্রচার মৌসুমে দ্রুত বিক্রয়যোগ্য পণ্যের চাহিদা ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে বিশেষ করে চা, বিস্কুট ও মুড়ির ক্ষেত্রে। আমদানিকরা বলছেন, এ বছর চিনির চাহিদা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আসন্ন রমজান ও নির্বাচন দুটোর প্রভাবই এর পেছনে রয়েছে। তবে সব খাত এ নির্বাচনি মৌসুমে লাভবান হয়নি। বড় পোস্টার ও প্লাস্টিক ব্যানার নিষিদ্ধ করায় কাগজকল ও ছাপাখানাশিল্প পড়েছে বড় ধাক্কায়। বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন জানান, এবারের নির্বাচনে পুরো মুদ্রণশিল্পের আয় হতে পারে মাত্র ১০০ কোটি টাকা, যেখানে আগের নির্বাচনে তা ছিল অন্তত ৮০০ কোটি টাকা। দেশের প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ছাপাখানার মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজে যুক্ত রয়েছে। রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলার ছাপাখানা ও মাইক সার্ভিস মালিকরাও জানান, এবারের নির্বাচন প্রত্যাশিত ব্যবসা এনে দেয়নি। আগে যেখানে একজন প্রার্থী ৮-১০টি মাইক নিতেন, এবার সেখানে অনেকেই ৩-৫টির বেশি নিচ্ছেন না।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নির্বাচন সাময়িকভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রাণ ফেরালেও এ অর্থনৈতিক তৎপরতা ক্ষণস্থায়ী এবং এর বড় অংশই রয়ে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার বাইরে। এটা কারও খরচ, আবার কারও আয়। অল্প সময়ের জন্য অর্থনৈতিক গতি আসে, কিন্তু আমরা এখনো তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।
তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
(ওএস/এএস/ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬)
