তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এছাড়া সব কয়টি নির্বাচনে গোপালগঞ্জের ৩টি আসন থেকে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা জামানত পর্যন্ত হারিয়েছেন। এ জেলায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্ম গ্রহন করেছেন। এখানকার আধিকাংশ ভোটার আওয়ামী লীগের সমর্থক। এ কারণে জেলাটি আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি হিসেবে দীর্ঘ বছর পরিচিত। এ ঘাঁটিতেই এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩টি আসনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে।

প্রার্থীরা ক্যারিশমা দেখিয়েছেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ের ভোটারদের কাছে গিয়েছেন, চেয়েছেন ভোট। নিরপত্তা, উন্নয়ন, হয়রানী বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেই, তাই বিকল্প হিসেবে ভোটাররা বিএনপিকে নিরাপদ বিবেচনায় ভোট দিয়েছে।এছাড়া হিন্দু (সনাতন) সম্প্রদায়ের মানুষ ভোট তারা পেয়েছেন। তাই বিএনপি আওয়ামী লীগের দুর্গে জয় পেয়েছে। এমন কথাই উঠে এসেছে সংশ্লিষ্টদের মন্তব্যে।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার কুশলী গ্রামের ভোটার আরমান আলী সিকদার (৫৫) বলেছেন, আমাদের আসন টুঙ্গিপাপাড়া-কোটালীপাড়া উপজেলা নিয়ে।এখানে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার পৈতৃক বাড়ি।রাজনৈতিকভাবে এ আসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল না। বিএনপি এ আসনে এসএম জিলানীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি আমাদের বাড়ি বাড়ি এসে দোয়া ও ভোট চেয়েছেন। দিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি। আমাদের মন তিনি সহজে জয় করে নিয়েছেন। এ কারণে তিনি বিজয়ী হয়েছেন।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমরিয়া গ্রামের তরুণ ভোটার কলেজ ছাত্র আসালত হোসেন তালুকদার (২০) বলেছেন, তারেক রহমানের রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা আমার ভাল লেগেছে। এছাড়া আমাদের ভোট টানতে জিলানী ভাই প্রচার প্রচারণায় তরুণদের ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণে আমি সহ তারুণ্যের ভোট তার পক্ষে গেছে।

কোটালীপাড়া উপজেলার পীড়ারবাড়ি গ্রামের কৃষক নিখিল হালদার (৬০) বলেন, আওয়ামী লীগ নেই। আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে? নিরাপদে থাকতেই আমরা আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপি নিবার্চিত করেছি।নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আমাদের প্রত্যাশা পুরণ করবেন, এমনটা আমি আশা করি।

মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু শিবু ঠাকুর বলেন, গোপালগঞ্জ জেলার ৩ আসনেই বিএনপি’র প্রার্থীরা আমাদের কাছে এসেছেন। আমরা তাদের সমর্থন দিয়েছি। তারা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভাল ভোট পেয়েছেন। এজন্য তাদের বিজয় সহজ হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গোপালগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেছেন, আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে এবারের ভোটে আওয়ামী লীগ ছিল না। এ জেলার অধিকাংশ মানুষ আওয়ামী লীগের ভোটার। দলটি নেই। এ সুযোগে নিরপত্তা, উন্নয়ন, হয়রানী বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বি্এনপির প্রার্থীরা। গেছেন ভোটারদের কাছে। তাদের ক্যারিশমায় ভোটাররা এবার বিএনপির দিকে ঝুঁকেছেন। এসব কারণে বিএনপি জিতেছে বলে আমার কাছে প্রতিয়মান হয়েছে।

গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিজয়ী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এসএম জিলানী গোপালগঞ্জে দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে বিএনপির বিজয় সম্পর্কে বলেন, এটি একটি বড় ধরণের বার্তা বা ম্যাসেজ। আসলে জনকল্যাণে রাজনীতি করা। নির্বাচনী এলাকার মানুষ আমাকে তাদের আপন ভাই হিসেবে, ঘরের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আগামীতেও আমার এই কাজগুলো অব্যাহত থাকবে।

ভোটারদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথা বলতে গিয়ে এস এম জিলানী বলেন, রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছে।তারা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি তাদেরকে সম্মান জানাই। সাথে সাথে তারা আমাকে যে সম্মানিত করেছে আমি তার মর্যদা রাখবো। ভোটারদেরকে দেয়া আমার সব প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য কাজ করবো।

গোপালগঞ্জ- ২ আসন থেকে নির্বাচিত ডা. কেএম বাবর বলেন, নির্বাচনের আগে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। তিনি বিএনপি’র চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বিগত দিনে যে উন্নয়ন হয়েছে, তার চেয়েও বেশি উন্নয়ন করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে গোপালগঞ্জের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং উন্নয়নের স্বার্থে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। পরে তিনি গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে বিএনপি’র প্রার্থীদের বিজয়ী করায় গোপালগঞ্জের ভোটারদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।

(টিবি/এসপি/ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬)