বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারবে বিএনপি?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রায় ১৭ বছর পর সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট ২১২ আসনে, জামায়াতের ইসলামী জোট ৭৭, স্বতন্ত্র ৭ অন্যান্যরা ১ আসনে জয়ী হয়েছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। এর মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর ফের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাচ্ছে দলটি।
একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার সাত সপ্তাহের মাথায় বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক হাসিনার পতন ঘটে। এরপরেই দেশে ফেরার সুযোগ পান তারেক রহমান। তিনি ২০০৮ সালে দেশ ছেড়েছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আটক থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। সে সময়ই তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে পা রাখেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার কয়েকদিনের মাথায় তার মা দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন তিনি। নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের পর এখন তার নেতৃত্বে সরকার গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে বিএনপি।
এদিকে এবারের জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটেরও আয়োজন করা হয়েছিল। গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা থেকে নিম্নস্তরের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাসহ একটি নতুন উচ্চকক্ষ তৈরি পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবর্তনের পক্ষে সম্মত হয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ মানুষ। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা সবার। এখন যদি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালুর বিষয়টি অনুমোদন পায় তাহলে দেশের সংসদীয় কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন আসবে।
১৫ বছর ধরে সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে কারচুপি ও জালিয়াতির মাধ্যমে বার বার সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে জোর করে দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে। বিরোধীদের অন্যায়ভাবে আটক বা হত্যা করা হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। শেখ হাসিনাকে এখনো নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছে তার দীর্ঘদিনের মিত্র নয়াদিল্লি।
তার অনুপস্থিতিতেই জুলাই-আগস্টের সময় করা অপরাধে বিভিন্ন মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং তার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত ১৮ মাস ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করেছে এবং গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। ভোটের আগে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, হিসাব-নিকাশের পর ভোটাররা দেশটির পুরোনো দল বিএনপিকেই বেছে নিয়েছেন।
২০০০ সালের শুরুর দিকে বিএনপির ক্ষমতায় থাকাকালীন, টানা পাঁচ বছর ধরে অলাভজনক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পারিবারিক ভাবেই রাজনীতিতে অংশ নেওয়া তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও নানা সময় বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু তিনি সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দেশে ফেরার পর বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। এবার তার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি যা বলেছেন আসলেও এমন কিছুই করতে চান।
এবার আরেকটি বিষয় হলো- বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির উত্থান। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট এবারের নির্বাচনে বেশ ভালো করেছে এবং তারা প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে।
অপরদিকে ২০২৪ সালের বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী জেন জি- জেনারেশনের প্রার্থীরা আশানুরুপ ফল না পেলেও একেবারে হতাশ করেনি। তাদের ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে লড়ার কারণে তাদের অনেক সমর্থক হতাশ হয়েছেন এবং কিছু প্রার্থী দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
নতুন সরকারের সামনে কিছু বড় সিদ্ধান্ত রয়েছে। বিএনপি বারবার সংস্কারের প্রতি প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছে। তাই তারা এগুলো বাস্তবায়ন করবে এমনটাই তাদের প্রতি সাধারণের মানুষের আশা রয়েছে।
ভোটে মানুষের জোয়ার দেখে স্বাভাবিক ভাবেই বলা যায় যে, বাংলাদেশে ভোট দেওয়ার গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন সরকার যদি এখন বড় বড় দাবিগুলো পূরণ করতে না পারে তাহলে এরচেয়ে হতাশার আর কিছুই হবে না। বিএনপির হাত ধরে নতুন সরকার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
তথ্যসূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট, রয়টার্স
(ওএস/এএস/ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬)
