জনআকাঙ্ক্ষার নতুন বাংলাদেশ
তারেক রহমান সরকারের অগ্নিপরীক্ষা ও উত্তরণের পথ
মীর আব্দুল আলীম
এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে এক নতুন বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। এই মুহূর্তে নতুন সরকারের সামনে প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হলো ভেঙে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরামত এবং নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গত কয়েক বছরে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার যে চরম অবনতি ঘটেছে, তা পুনরুদ্ধার করাই হবে এই প্রশাসনের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। ভয়ের সংস্কৃতি দূর করে রাজপথে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা না গেলে কোনো সংস্কারই স্থায়ী রূপ পাবে না।
একই সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এক বিশাল বোঝা। যখন চাল, ডাল আর লবণের দামে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ওঠে, তখন যেকোনো আদর্শিক আলাপ অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই নতুন সরকারের সামনে এখন পুষ্পশয্যা নয়, বরং পুঞ্জীভূত পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা থেকে শুরু করে সড়ক, শিল্প থেকে শুরু করে বৈদেশিক সম্পর্ক প্রতিটি স্তরে যে ক্ষয়ের চিহ্ন ফুটে উঠেছে, তা সারিয়ে তুলতে দরকার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য এবং ইস্পাতকঠিন সিদ্ধান্ত।
বাজারের লাগাম টানাতে হবে সবার আগে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি যেখানে ২.৭৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের ৮.৫৮ শতাংশ হওয়াটা চরম আশঙ্কাজনক। তারেক রহমান সরকারকে দায়িত্ব নিয়েই প্রথম যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে এই মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে। টাকার মান ধরে রাখা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় প্রয়োজন। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ওপর আমদানিতে শুল্ক সাময়িকভাবে হ্রাস করা এবং বাজারে তারল্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরাসরি কৃষকের কাছে ভর্তুকি পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে। গত কয়েক বছরে পুলিশি ব্যবস্থায় যে দলীয়করণের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসাই হবে নতুন সরকারের প্রধান কাজ। থানাকে হতে হবে সাধারণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। ভয়ের সংস্কৃতির পরিবর্তে আইনের শাসনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণে সুসজ্জিত করতে হবে যাতে তারা মানবাধিকার বজায় রেখে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে হবে।
নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। রাতে ঘরে নিরাপদে ঘুমানো এবং দিনে নির্ভয়ে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করাই হবে জননিরাপত্তার মূল লক্ষ্য। এজন্য কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো কালো অধ্যায়গুলো চিরতরে বন্ধ করে আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীকে সাজার আওতায় আনতে হবে। যখন রাষ্ট্রের সাধারণ একজন মানুষ অনুভব করবে যে রাষ্ট্র তার পাশে আছে, তখনই কেবল জননিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে বলা যাবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ তারুণ্যকে রক্ষায় আপসহীন লড়াই হোক নয়া সরকারের অঙ্গীকার। মাদক একটি প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তারেক রহমান সরকারকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। কেবল মাদকসেবী নয়, বরং মাদকের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) আরও আধুনিকায়ন করতে হবে যাতে সীমান্ত দিয়ে মাদক না ঢুকতে পারে। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারিভাবে পর্যাপ্ত রিহ্যাব সেন্টার স্থাপন করতে হবে। মাদকের অর্থায়ন বা মানি লন্ডারিংয়ের সাথে জড়িত রাঘববোয়ালদের কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া যাবে না।
সিন্ডিকেটের অবসান বাজার ও অর্থনীতির মুক্তি জরুরি। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে গুটিকয়েক ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। এই সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দ্রব্যমূল্য বাড়ায়। নতুন সরকারকে এই চক্র ভাঙতে হবে। কম্পিটিশন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং একচেটিয়া ব্যবসা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া বা টেন্ডারবাজিতে যে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা রয়েছে, তা ই-টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে শতভাগ স্বচ্ছ করতে হবে। ব্যবসায়ী ও রাজনীতির যে অশুভ আঁতাত দেশের সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, তার মূলোৎপাটন করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
শিল্প উন্নয়ন ও বন্ধ কারখানা সচলকরণ করতে হবে। শিল্পায়নই কর্মসংস্থানের মূল চাবি। দেশের অনেক জুট মিল, টেক্সটাইল মিল এবং ভারী শিল্প কারখানা ঋণের বোঝা বা অব্যবস্থাপনার কারণে বন্ধ হয়ে আছে। এগুলোকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় পুনরায় সচল করতে হবে। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করতে হবে এবং শিল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। বিসিক শিল্পনগরীগুলোকে আধুনিকায়ন করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) উৎসাহ দিতে হবে।
সড়কে শৃঙ্খলা মৃত্যুর মিছিল থামানো হবে আরেক চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের সড়ক এখন মরণফাঁদ। প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ ঝরছে সড়কে। এই নৈরাজ্য বন্ধে পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজি বন্ধ করা প্রথম কাজ। লাইসেন্স বিহীন চালক এবং ফিটনেস বিহীন গাড়ি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজড করতে হবে। বিআরটিএকে দুর্নীতির আখড়া থেকে মুক্ত করে স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে।
বৈদেশিক সম্পর্ক দৃঢ়করণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অর্থনীতি সচল করতে পারে।পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দরকার এক দক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে প্রতিবেশী ভারতসহ চীন, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীর করতে হবে। বিশেষ করে ভারতের সাথে বিদ্যমান অমীমাংসিত ইস্যুগুলো পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নতুন বাজার তৈরি এবং বর্তমান রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার মান বর্তমানে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ডিগ্রিধারী বেকার তৈরির পরিবর্তে কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাগারে পরিণত করতে হবে এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে শিক্ষকদের মুক্ত রাখতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে জিডিপির সম্মানজনক অংশ বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে একটি সৃজনশীল ও মননশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে আগামীর বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।
দুর্নীতি দমন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা আনয়ন সরকারকে অগ্রণীর ভূমিকায় থাকতে হবে। দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। নতুন সরকারের উচিত হবে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও শক্তিশালী করা। সরকারি প্রতিটি দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল গভর্নেন্স চালু করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা কেবল স্লোগানে নয়, বরং বড় বড় অপরাধীদের বিচার করার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নতুন সরকারকে জ্বালানি আমদানিতে পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে মনযোগী হতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের মতো বিতর্কিত চুক্তিগুলো পুনঃমূল্যায়ন করে সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে। গ্রামে ও শহরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার এবং সাধারণের নাগালের চিকিৎসা পৌঁছাতে হবে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন অতিমাত্রায় বাণিজ্যমুখী হয়ে পড়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর মানোন্নয়ন করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছাতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ঔষধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। চিকিৎসকদের মফস্বলে অবস্থান নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রণোদনা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্যবীমা চালু করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত যাতে নিম্নবিত্ত মানুষ ব্যয়বহুল চিকিৎসার বোঝা থেকে মুক্তি পায়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার সবার যেন প্রাধান্য পায়। বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের অন্যতম বড় কাজ। উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে নিম্ন আদালত পর্যন্ত বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মামলা জট নিরসনে উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। বিচারক নিয়োগে একটি নির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি করতে হবে যাতে কোনো দলীয় প্রভাব সেখানে কাজ না করে। মানুষ যখন অনুভব করবে যে টাকা বা ক্ষমতা ছাড়াই ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব, তখনই রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতন্ত্র বিকশিত হবে।
যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি তবে নয়া সরকারকে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ তরুণ। এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগাতে হলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। তরুণদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি উদ্ভাবনীমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলাই হবে নতুন সরকারের প্রকৃত সার্থকতা।
একটি দেশের পুনর্গঠন একদিনে সম্ভব নয়, তবে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবও নয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে সুযোগ এসেছে একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার। জনগণ কেবল বড় বড় প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ডাল-ভাতের সংস্থান আর শান্তিতে ঘুমানোর নিশ্চয়তা চায়। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং আইনের শাসন কায়েম করার মাধ্যমেই এই সরকারের সফলতা নির্ধারিত হবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার এই বিশাল চাপকে শক্তিতে রূপান্তর করে সরকার দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নেবে। এটাই আজ কোটি প্রাণের প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক, সমাজ গবেষক।
