মানিক লাল ঘোষ


ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনে ‘শিব’ কোনো সাধারণ পৌরাণিক চরিত্র নন; তিনি অনাদি, অনন্ত এবং অমোঘ শক্তির আধার। ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে যখন প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তন ঘটে, তখনই উদযাপিত হয় মহাশিবরাত্রি বা শিবচতুর্দশী। এটি কেবল উপবাস বা প্রদীপ প্রজ্বলনের উৎসব নয়, বরং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং স্থূল থেকে সূক্ষ্মের দিকে যাওয়ার এক মহাজাগতিক যাত্রা।

শিবচতুর্দশীর মাহাত্ম্য বুঝতে গেলে ‘লিঙ্গপুরাণ’-এর সেই আদি কাহিনী স্মরণ করতে হয়। লোকগাথা অনুযায়ী, এই তিথিতেই ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই থামিয়ে দিতে মহাদেব এক বিশাল জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যার আদি বা অন্ত খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল। এই ‘জ্যোতি’ আসলে আমাদের অন্তরাত্মার প্রতীক। শিবরাত্রির মূল বার্তা হলো নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে সেই অসীম শক্তির সামনে আত্মসমর্পণ করা।

চার প্রহরের পূজা: বিবর্তনের স্তর শিবরাত্রির ব্রত পালিত হয় রাতের চারটি প্রহরে। প্রতিটি প্রহরের অর্ঘ্য ও স্নানের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন: প্রথম প্রহর: দুগ্ধ দিয়ে অভিষেক। এটি শান্তির প্রতীক। আমাদের মনের কলুষতা দূর করে ভক্তিভাব জাগ্রত করে। দ্বিতীয় প্রহর: দধি দিয়ে অভিষেক। দই যেমন দুধের রূপান্তরিত রূপ, তেমনই এটি ভক্তের ধৈর্য ও স্থৈর্যের প্রতীক। তৃতীয় প্রহর: ঘৃত বা ঘি দিয়ে অভিষেক। এটি তেজ ও শক্তির প্রতীক, যা মনের অন্ধকার ও জড়তাকে পুড়িয়ে ফেলে। চতুর্থ প্রহর: মধু দিয়ে অভিষেক। এটি পরম আনন্দের প্রতীক। সাধনার শেষে ভক্ত যখন নিজেকে ঈশ্বরের চরণে সঁপে দেয়, তখন সে আধ্যাত্মিক মাধুর্য আস্বাদন করে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিচারে, এই রাতে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ এমনভাবে অবস্থান করে যে মানুষের মেরুদণ্ড দিয়ে এক বিশেষ শক্তি ঊর্ধ্বগামী হয়। তাই এই রাতে সোজা হয়ে বসে থাকা বা জেগে থাকাকে সাধকরা অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। আধুনিক যোগী ও তাত্ত্বিকদের মতে, শিবরাত্রি হলো ‘The Darkest Night’ বা ঘন অন্ধকার রাত। এই অন্ধকার আসলে এক বিশাল শূন্যতা। সেই শূন্যতা থেকেই নতুন সৃষ্টির বীজ অঙ্কুরিত হয়। শিব শব্দের অর্থই হলো ‘যা নেই’ (That which is not)। অর্থাৎ জগত যখন লয় পায়, যা অবশিষ্ট থাকে তাই শিব।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণে শিবরাত্রি নারীদের কাছে এক বিশেষ আবেগের জায়গা। প্রচলিত লৌকিক বিশ্বাসে মেয়েরা শিবের মতো ধৈর্যশীল ও যত্নবান স্বামী কামনা করে এই ব্রত করেন। তবে এর মূল তাৎপর্য আরও গভীরে। শিব ও পার্বতী হলেন পুরুষ ও প্রকৃতির প্রতীক। এই তিথিতে হিমালয়-কন্যার দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও কৃচ্ছ্রসাধনার জয় হয়েছিল। এটি নারীশক্তির দৃঢ়তা এবং বৈরাগ্য ও গার্হস্থ্য জীবনের সার্থক সমন্বয়ের উৎসব। শিব যেমন শ্মশানচারী বৈরাগী, তেমনই তিনি পার্বতীর সাথে সুখী সংসারী—এই দুই বিপরীতমুখী চরিত্রের মিলনই শিবচতুর্দশী।

আজকের কোলাহলপূর্ণ বিশ্বে শিবচতুর্দশী আমাদের ‘মৌন’ বা নীরবতার শিক্ষা দেয়। চারপাশের অবিরাম তথ্য ও উত্তেজনার মাঝে শিবের ‘ধ্যানমগ্নতা’ হলো আত্মানুসন্ধানের শ্রেষ্ঠ পথ। শিবের নীলকণ্ঠ হওয়া আমাদের শেখায় কীভাবে পৃথিবীর হলাহল বা নেতিবাচকতাকে হজম করে নীলকণ্ঠ হয়েও মানুষের মঙ্গল করা যায়।

শিবচতুর্দশী মানে কেবল শিবলিঙ্গে জল ঢালা নয়, বরং নিজের ভেতরের ‘শিবত্ব’কে জাগিয়ে তোলা। এই রাতে আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত—আমাদের মনের কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহ যেন মহাদেবের তৃতীয় নেত্রের অগ্নিতে ভস্মীভূত হয়। অমানিশার আঁধার কেটে গিয়ে যখন ভোরের আলো ফুটে ওঠে, সেই আলোকবর্তিকা যেন আমাদের কর্ম ও চিন্তায় প্রতিফলিত হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।