ইমা এলিস, নিউ ইয়র্ক : মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সময় নিউ ইয়র্ক পুলিশের গুলিতে একাধিকবার আহত হওয়া কুইন্সের ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশি যুবকের বিরুদ্ধে হামলার চেষ্টা ও অস্ত্র রাখার অভিযোগে অভিযোগপত্র গঠন করা হয়েছে। এতে তার পরিবার, আইনজীবী এবং নিউ ইয়র্কের মেয়র  জোহরান মামদানিসহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

শুক্রবার কুইন্স জেলা অ্যাটর্নি মেলিন্ডা ক্যাটজ জানান, ব্রায়ারউড এলাকার বাসিন্দা বাংলাদেশি যুবক জাবেজ চক্রবর্তী বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির হামলার চেষ্টা এবং চতুর্থ ডিগ্রির অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।

চক্রবর্তী, যিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় এক পর্যায়ে ভেন্টিলেটরে ছিলেন, তাকে কুইন্স সুপ্রিম কোর্টের বিচারক জেসিকা আর্ল-গারগানের সামনে হাজির করা হয়। আদালত তাকে আগামী ১১ মার্চ আবার হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

ডিএ কাটজ জানান, অভিযোগ ও তদন্ত অনুযায়ী, ২৬ জানুয়ারি সকাল প্রায় ১০টা ২৫ মিনিটে চক্রবর্তীর এক আত্মীয় ৯১১ নম্বরে ফোন করে জানান যে তিনি পারিবারিক বাসার ভেতরে কাচ ভাঙচুর করছেন।

দুইজন নিউ ইয়র্ক পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরে ঢুকলে তারা রান্নাঘরে চক্রবর্তীকে দেখতে পান। এরপর তিনি একটি বড় ছুরি তুলে নিয়ে তাদের দিকে এগোতে শুরু করেন এমনটাই প্রসিকিউটরদের দাবি এবং চলতি মাসে প্রকাশিত বডি-ক্যাম ফুটেজে দেখা যায়।

ডিএ অফিস জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি নাকি কর্মকর্তার দিকে এগোতে থাকেন এবং ছুরির ধরন বদলে উল্টো করে ধরে ডান হাত পিছনে টেনে নেন।

একজন কর্মকর্তা পেছনে সরে গিয়ে ঘরের ফয়্যার ও লিভিংরুমের মাঝের দরজা বন্ধ করলে চক্রবর্তী নাকি সেই দরজা খুলে আবার এগিয়ে আসেন। তখন ওই কর্মকর্তা চার রাউন্ড গুলি করেন।

প্রসিকিউটরদের মতে, গুলি ছোড়ার আগে অন্তত আটবার তাকে ছুরি নামাতে বলা হয়েছিল।
চক্রবর্তীকে জামাইকা হাসপাতাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়, যেখানে তিনি এখনও চিকিৎসাধীন।

ডিএ কাটজ বলেন, অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি বড় ছুরি হাতে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে আক্রমণ করার চেষ্টা করেন, বারবার বলা সত্ত্বেও অস্ত্র নামাননি এবং দরজা ঠেলে এগিয়ে আসেন। এরপর কর্মকর্তা আত্মরক্ষার্থে গুলি করেন এবং চারবার আঘাত করেন।

তিনি আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় থাকলেও প্রসিকিউটরদের দায়িত্ব হলো প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এই ধরনের মামলায় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে ভিন্ন ধরনের সমাধানও হতে পারে।

পরিবার ও আইনজীবীদের ক্ষোভ

জাবেজের মা জুলি চক্রবর্তী এই অভিযোগকে 'দুঃস্বপ্ন' বলে উল্লেখ করেন এবং ডিএ কাটজকে অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আমাদের পুলিশের দরকার ছিল না, শুধু মেডিক্যাল সহায়তা দরকার ছিল। আমরা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৯১১-এ ফোন করেছিলাম, কখনো ভাবিনি আজকের পরিস্থিতিতে পড়ব। পুলিশ আসার আগ পর্যন্ত আমরা নিরাপদ ছিলাম। এখন জাবেজ বহু অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতালের বিছানায় হাতকড়া পরা অবস্থায় পড়ে আছে। সে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন ডিএ তাকে জেলে পাঠাতে চায় সে কি যথেষ্ট ভোগেনি?

তিনি আরও বলেন, পুরো ঘটনা পরিবারের জন্য ভয়াবহ মানসিক আঘাতের কারণ হয়েছে এবং তারা নিজেদের সামনে জাবেজকে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছেন।

চক্রবর্তী পরিবারের আইনজীবী সংস্থা লিগ্যাল এইড সোসাইটি জানায়, জাবেজের কোনো পূর্ব অপরাধের রেকর্ড নেই এবং তার পরিবার চিকিৎসা সহায়তার জন্যই ফোন করেছিল।

সংস্থাটি দাবি করে, জাবেজ একাধিক অস্ত্রোপচার ও ভেন্টিলেশনের মধ্য দিয়ে গেছে, এখনও হাসপাতালে ভর্তি এবং পুলিশ পাহারায় শয্যাশায়ী। পরিবার অভিযোগ করেছে, পুলিশ সদস্যরা তাদের ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস নিয়ে প্রশ্ন করেছে, ফোন জব্দ করেছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা থানায় আটকে রেখেছে।

ডিএ অফিসের কাছ থেকে এখনও পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ বাকি রয়েছে বলে জানায় লিগ্যাল এইড সোসাইটি।
জাবেজের নাগরিক মামলার আইনজীবী গিডিয়ন অলিভার বলেন, ডিএ কাটজের তড়িঘড়ি ও গোপন অভিযোগপত্র সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং অমানবিক। জাবেজের চিকিৎসা দরকার, কারাবাস নয়।

মেয়র মামদানি বলেন, কোনো পরিবারই এমন যন্ত্রণা পাওয়ার যোগ্য নয়। জাবেজের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত নয়, বরং তাকে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা দেওয়া উচিত। তার হাতকড়া খুলে দেওয়া হোক এবং প্রয়োজনীয় যত্ন দেওয়া হোক।

তিনি আরও বলেন, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে আমাদের শহরে প্রতিরোধ, সহানুভূতি ও সংকটকালীন যত্নভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

(আইএ/এসপি/ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬)