রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সরকারি খাস জমির উপর নির্মাণ করা দোকানঘর দখল ও বেদখলকে কেন্দ্র করে ধানের শীষ প্রতীকের নেতা কর্মীদের হামলায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ফুলবল প্রতীকের প্রার্থী ডাঃ শহীদুল আলমের আটজন কর্মী ও সমর্থককে পিটিয়ে জখম করা হয়েছে। গত শনিবার সন্ধ্যায় সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামের মোজামের মোড় বটতলা নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

আহতরা হলেন- ফতেপুর গ্রামের মীর জিয়াদ আলীর ছেলে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মীর আনোয়ারুল ইসলাম আকুল (৫০), তার ভাই ইউনিয়ন যুবদলের আহবায়ক মীর শাহীনুর রহমান (৪০), ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি মীর হাসানুজ্জামান লিটন, মীর শাহীনুরের স্ত্রী ইউনিয়ন যুবদলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা মরিয়ম, মীর মনিরুলের স্ত্রী নাজমা খাতুন, মীর হাসানুজ্জামান লিটনের স্ত্রী ওজুফা খাতুন, একই গ্রামের সৈয়দ আলী কারিকরের ছেলে ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি আব্দুস সাত্তার ও আতাউর রহমানের ছেলে শফিউল আযম।

কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সাবেক সহসভাপতি মীর আনোয়ারুল ইসলাম আকুল জানান, বিগত ২০০০ সালে ফতেপুর বটতলায় মোজাম স্মৃতি সংঘের কিছু জায়গা দখল করে নেয় তৎকালিন আওয়ামী লীগ নেতা প্রাণী চিকিৎসক হাবিবুর রহমান। ৫ আগষ্ট পরবর্তী ওই জায়গা তারা দখল করে বিগত ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত) গরীবের ডাক্তার খ্যাত শহীদুল আলমের ফুটবল প্রতীকের নির্বাচনী আফিস করা হয়। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে ওই অফিস দখল করে কাজী আলাউদ্দিনের ধানের শীষের অফিস করার চেষ্টা চালায় দক্ষিণ শ্রীপুরের বিএনপি নেতা জুলফিকার সাঁফুই। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদীয় নির্বাচনে ফতেপুর সরকারি পাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ফুটবল প্রতীকে ৮০২ টি ও ধানের শীষ প্রতীকে ২০০টি ভোট পায়। সাতক্ষীরা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী রবিউল বাশার জয়লাভ করেন। ধানের শীষের প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য তারা ফুটবল প্রতীকের নেতা -কর্মীদের দায়ী করতে থাকেন। এরই একপর্যায়ে গত শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান পাড় এর নেতৃতে জুলফিকার সাফুই জামায়াত কর্মী ওমর ফারুকসহ কয়েকজন তাদের ফুটবল প্রতীকের নির্বাচনী অফিস দখল করে তালা মেরে দেয়।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর পোষ্ট দেওয়া হলে শনিবার বিকেলে তারা মোজাম মোড়ে তাপস ঘোষ, শিমুল হোসেন ও শাহাদাৎ হোসেনসহ কয়েকজন সাংবাদিকের কাছে বাস্তবতা উল্লেখ করে ভিডিও বক্তব্য দিচ্ছিলেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে নুরুজামানান পাড়ের নেতৃত্বে গুচ্ছগ্রামের গাজী আব্দুল খালেক. বেড়াখালির বারুনিতলার আলতাফ ভগবান যশোমন্তপুরের আনিসুর রহমান, ফতেপুরের আব্দুস সবুরের ছেলে জামায়াত কর্মী জিল্লুর রহমান, আমিরুল ইসলাম, হাফিজুল ইসলাম, ওমর ফারুক, নীলকণ্ঠপুরের ইদ্রিস সরদার, বিষ্ণপুরের ফিরোজ ঢালী, ফতেপুরের মোস্তাফিজুর পাড়, শাহীনুর কারিকর, লুৎফুর কারিকর, আব্দুল জলিল পাড়, লোকমান গাজী, চাঁচাই গ্রামের আলতাফ হোসেন, আব্দুল মালেক, ফিরোজ হোসেন, সিরাজুল কারিকর(কাঠমিস্ত্রী), বাঁশতলার সিরাজুল ইসলামসহ বিষ্ণুপুর, চাঁচাই, নীলকণ্ঠপুর, ফতেপুর, বন্দকাটি এলাকার ১৫০/১৬০ জন তাদের উপর হামলা চালায়। হামলায় তিনিসহ তার পরিবারের ছয়জন সদস্য, আব্দুস সাত্তার ও আযমসহ কয়েকজন জখম হন। এ সময় তারা জীবন বাঁচাতে অন্যের দোকানে ঢুকে পড়েন। পরে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যসহ বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম এ্যম্বুলেন্সে করে তাদেরকে উদ্ধার করে রাত ৯টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এরপর হামলাকারিরা তাদের বাড়িতে যেয়ে নানাভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছে।

এদিকে ফতেপুর গ্রামের নূরজাহান বেগম জানান, তার স্বামী হাবিবুর রহমান গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি মারা যান। ২০১১ সালে স্থানীয় শহীদুল ইসলামের স্ত্রী সুফিয়া খাতুনের ডিসিআরকৃত প্রায় ছয় শতক জমি কিছু টাকা দিয়ে এফিডেফিডের মাধ্যমে তার (নূরজাহান) গ্রহণ করেন স্বামী হাবিবুর রহমান। তাতে দুটি ঘর বানিয়ে একটিতে মীর আনোয়ার হোসেন আকুল ও কাঠ মিস্ত্রী আজগার আলীকে ভাড়া দেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন আকুল তার ভাড়া বন্ধ করে দিয়ে আজাগার আলীর কাছ থেকে ভাড়া আদায় করতে থাকেন। পরে একটি ঘর নূর ইসলামের ছেলে কাদেরের কাছে ভাড়া দেন আকুল। প্রতিকার না পাওয়ায় আর্থিক অনটনে পড়ে দুশ্চিন্তায় ড়ত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বামী হাবিবুর রহমান মারা যান। ছেলে রবিউল ইসলাম জিম ওই দোকান ফিরে পাওয়ার জন্য নুরুজ্জমান পাড়, ওমর ফারুকসহ সর্বশ্রেণীর মানুষের দ্বারস্ত হন।

ভোট শেষে তারা সমাধান করে দেবেন বলেন জানান। এরই মাঝে জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে মীর আনোয়ারুল ইসলাম আকুল, তার ভাই শাহীনুর, শফিউল আযম, আব্দুস সাত্তারসহ কয়েকজন তাদের (নূরজাহান) দোকানঘর ফুটবল প্রতীকের নির্বাচনী অফিস বানায়। গত ২ ফেব্রুয়ারি কালিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের অফিস থেকে তাদের ওই দোকানে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক মিটারের বকেয়া বিল বাবদ সাত হাজার ৮৮০ টাকার নোটিশ দেওয়া হলে তারা তা পরিশোধ করেন। শুক্রবার সকাল ১১ টার দিকে আলোচনা সাপেক্ষে দোকনের চাবি তার ছেলে রবিউল ইসলাম জিম এর হাতে তুলে দেন নুরুজ্জামান পাড় ও ওমর ফারুকসহ কয়েকজন। শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মীর আনোয়ারুল ইসলাম, শফিউল আযম, আব্দুস সাত্তারসহ কয়েকজন তাদের দোকানঘর আবারো দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের মিথ্যা তথ্য দিতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তাদের কয়েকজনকে মারপিট করে। তার দোকানঘর দখলের হুমকি দেওয়ায় তিনি রবিবার থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় আব্দুল ওহাব, রফিকুল ইসলাম ও হামিদুল ইসলাম জানান, গত সংসদীয় নির্বাচনকে ঘিরে এক সময়কার আওয়ামী লীগের নেতা শফিউল আযমসহ কয়েকজন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা ডাঃ শহীদুল আলমের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার প্রচারনা শুরু করেন। এক সময় আওয়ামী লীগ করলেও মীর আনোয়ারুল ইসলাম বিএনপিতে যোগ দেন। নির্বাচনে কাজ করেন ফুটবল প্রতীকে। নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিনের হারের কারণ হিসেবে ফুটবল প্রতীকের কর্মীদের দায়ী করা হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় এক সময়কার হাবিবুর ডাক্তারের ঘর দখল ও বেদখলকে কেন্দ্র করে শনিবার সন্ধ্যায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে রবিবার বিকেলে কালিগঞ্জ সদরে মতিয়ার রহমানের ব্যবসায়িক ভবনের নীচের তলায় ফুটবল প্রতীকের নির্বাচনী অফিনে জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে নলতা ইউপি চেয়ারম্যান আরিজুল ইসলাম, বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমসহ বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত বেশ কিছু নেতা কর্মী উপস্থিত ছিলেন।

কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডাঃ রুপা রানী পাল জানান, আহতদের কয়েকজনকে এক্স-রেসহ ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের সক্রিয় কর্মী ফতেপুরের ওমার ফারুক জানান, ঘটনার সময় শনিবার বিকেলে তিনি সাতক্ষীরায় ছিলেন। তবে জবরদখলকারি মীর আনোয়ারুল ইসলাম ও তার ভাইদের কাছ থেকে তিনিসহ বিএনপি নেতা নুরুজ্জামান পাড় শুক্রবার সকালে প্রকৃত মালিক হাবিবুর রহমানের ছেলে রবিউল ইসলাম জীম এর হাতে তুলে দেন। জবরদখলকারিরা আবারো ওই দোকান দখল করার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা প্রতিহত করে। এতে উভয়পক্ষের কয়েকজন আহত হয়।

এ ব্যাপারে রবিবার রাত সাতটা চার মিনিটে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান পাড় এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুয়েল হোসেন জানান, এ ঘটনায় ফতেপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তার বাদি হয়ে রবিবার থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

(আরকে/এসপি/ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬)