রাজনীতি হোক মানুষের জন্য, মানুষ নিয়ে নয়
রহিম আব্দুর রহিম
নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আজ বুধবার দিনের পূর্বাহৃ সাংসদ হিসেবে শপথ নেবার পরপর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘এটা ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব।' অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক ভাষ্য। জাতি দায়িত্ববানদের পাশে থাকবেন এটাই সত্য। এছাড়া বিএনপির সকল কেন্দ্রীয় নেতারা এবার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বারবার হুশিয়ারি উচ্চারণ করে আসছেন। স্বয়ং নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভোটের আগের প্রায় জনসভায় দুর্নীতি সমুলে উৎখাতের কঠিন হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাঁর এবং তাঁর দলের এই হুশিয়ারি বাস্তবতায় পরিনত হলে মানুষের কাছে পরের বার ভোট চাইতে যেতে হবে বলে আমার মনে হয় না।
আমরা চাই দেশের মানুষের জান মালের নিরাপত্তা। সকল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত। পতিত সরকারের আমলে সকল প্রকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করতো পুলিশ বাহিনীর একটি অসৎ ইউনিট। উন্নয়ন কাজের কমিশন বাটোয়ারাতে সিদ্ধ হস্তছিল তৃণমূলের সিভিল প্রশাসন। ৫ আগস্টের পরবর্তী সরকারের দীর্ঘ ১৮ মাস পুলিশের অসৎ কর্মকর্তারা একই কায়দায় বিভিন্ন স্থানে চেইনম্যান নিয়োগ দিয়ে দলের আতি-পাতি নেতাদের মাধ্যমে চুটিয়ে চাঁদাবাজি করেছে, করছে। এর মধ্যে প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা এবং মামলা বাণিজ্য। ভোটের পরপরই প্রশাসনিক এবং পুলিশের কিছু সুবিধাবাদী কর্মকর্তারা নির্বাচিত সরকারের নেতাদের সাথে সংখ্যতা গড়ে তুলতে দৌঁড় -ঝাঁপ শুরু করেছে। অর্থাৎ এই সুবিধাবাদীরা যখন যেমন, তখন তেমন চরিত্রের। খুব দ্রুত এরা যে কোন দলের বড় ত্যাগী নেতার ভূমিকা অবতীর্ণ হয়। অতি উৎসাহী হয়ে রাষ্ট্রের আইনের রক্ষক সেজে ভক্ষন করে। আর এই দুষ্টুচক্রের প্যাঁচে পড়েই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সততায় কলঙ্ক লেপন হয়। এতে করে কারো দেশ ছাড়তে হয় আবার কারো জেলে ঢুকতে হয়।
বিএনপি যদি সত্যিকার জনবান্ধব সরকারের ভূমিকায় অবর্তীন এবং দায়িত্ববান সরকারের চরিত্র সমাজ রাষ্ট্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তবে সমাজ, রাষ্টের পরতে পরতে লেগে থাকা দুষ্টুদের চিহ্নিত করে কঠিন হস্তে তাদের দমন করতে হবে। আন্দোলন যে উশৃঙ্খলতা নয়, সেটাও সুপ্রতিষ্ঠিত করতে যে কোন মব কঠোর হস্তে দমন করার প্রয়োজন রয়েছে। দেশ পরিচালনা যে পুতুল খেলা নয়, তা মব সৃষ্টিকারীদের বুঝিয়ে দিতে হবে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে। বিগত ১৮ মাসে দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে চরম আঘাত এসেছে।আউল বাউলের এইদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিস্তব্ধ করে রেখেছে। ধর্ম অবমাননার অজুহাতে এক সহজ সরল বাউলকে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন ভাস্কর্য, ম্যুরাল, ফলকসমূহুের। হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলায় ভারী হয়ে পড়েছে আইন আদালত।
স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের কোন পতিত সরকারের রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত রাখা গণতন্ত্রে সমর্থিত নয়। অনেক সাংবাদিক, লেখকরা দেশ ছেড়েছেন, কেউ কেউ বিনা বিচারে জেল হাজতে।বারবার মানবতা বিপর্যস্ত হয়েছে। গণতন্ত্রকে অর্থবহ এবং শক্তিশালী করতে উদার গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখা যেমন জরুরী, তেমনি সদ্য বিদায়ী বিগত ১৮ মাস সরকারে থাকাদের জবাবদিহীতার আওতায় আনারও দরকার রয়েছে। কারণ, তারা দেশ সেবার নামে কোন অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট করেছেন কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত। যদি তাদের সেবায় স্বচ্ছতা থাকে তবে তাঁদের নামধাম সততার ইতিহাস অংকিত হবার দরকার রয়েছে। আর যদি তিল পরিমান লুটপাটের মত কিছু পাওয়া যায়; তবে তাঁকে আইনের আওতায় আনা গেলে দেশে দ্রুত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব অন্যথায় যা হবার তাই।
ভুলে গেলে চলবে না, লুটেদের লুটপাটের জন্য বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়নি। জাতি জানে, বিএনপি কোন ভূফোঁড় রাজনৈতিক সংগঠন নয়। যে রাজনৈতিক সংগঠন কোন গাদ্দার বাহিনীর হুংক্কারে কাছে কূপোকাত হবে। জনগণ ধারা নির্বাচিত সরকারের পাশে জনগণ আছে, থাকবে। কারণ, জনগণ ঠিকই বুঝেন, যারা রাজনীতি করেন তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। অতএব, যে রাজনৈতিক দল মানুষের জন্য রাজনীতি করবে তারাই টিকে থাকবে। যারা মানুষ নিয়ে রাজনীতি করবে তাদের পতন কোন না কোন সময় হবেই এটাই বাস্তবতা। আমরা চাই, রাজনীতি হোক মানুষের জন্য, মানুষ নিয়ে নয়।
লেখক: নাট্যকার ও গবেষক।
