অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সামাজিক ভারসাম্য
ওয়াজেদুর রহমান কনক
বিশ্বায়িত অর্থনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা এবং দ্রুত পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোর যুগে মানবসভ্যতার সামনে সবচেয়ে মৌলিক যে প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে, তা হলো—উন্নয়ন কি সবার জন্য সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করছে, নাকি বৈষম্যের নতুন রূপ সৃষ্টি করছে? এই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা, যা কেবল আইনি সমতা বা সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনৈতিক সম্পদের বণ্টন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং মানবিক মর্যাদার পূর্ণ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনে সামাজিক ন্যায়বিচার একটি বহুমাত্রিক ধারণা। এটি একদিকে যেমন ন্যায্য বণ্টনের অর্থনীতি—অর্থাৎ সম্পদ, আয় ও সুযোগের সমতা—অন্যদিকে তেমনি স্বীকৃতির রাজনীতি, যেখানে প্রান্তিক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ—এসবই এই বৃহত্তর ন্যায়–চিন্তার ফলশ্রুতি।
বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য কেবল আয়ের ব্যবধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি, প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হচ্ছে। দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনা তাই কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং কাঠামোগত ও নীতিগত প্রশ্ন। যখন একটি সমাজে কিছু মানুষ জন্মগত পরিচয়, লিঙ্গ, জাতিগত অবস্থান বা ভূগোলের কারণে উন্নয়নের মূলধারায় প্রবেশ করতে পারে না, তখন ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি হয়ে ওঠে অস্তিত্বগত।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক ন্যায়বিচার একটি নৈতিক আহ্বানও বটে। এটি রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ককে পুনর্বিবেচনার দাবি তোলে। উন্নয়ন যদি কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা মানবিক মর্যাদার পূর্ণতা নিশ্চিত করতে পারে না। প্রয়োজন এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো, যেখানে সুযোগের সমতা বাস্তবায়িত হবে, দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, এবং সামাজিক বৈষম্য হ্রাস পাবে দীর্ঘমেয়াদি নীতির মাধ্যমে।
সামাজিক ন্যায়বিচার তাই একটি স্থির ধারণা নয়; এটি পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে অভিযোজিত এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন প্রবাহ কিংবা প্রযুক্তিগত রূপান্তর—প্রতিটি ঘটনাই নতুনভাবে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নির্ধারণ করছে। ফলে এই ধারণার তাৎপর্য কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানবসভ্যতার দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সমতা, মর্যাদা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার।
২০ ফেব্রুয়ারি পালিত World Day of Social Justice কেবল একটি প্রতীকী আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি সমকালীন বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি, উন্নয়ন–দর্শন ও মানবাধিকার রাজনীতির এক কেন্দ্রীয় ধারণাকে সামনে আনে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে গৃহীত প্রস্তাবের মাধ্যমে ২০০৯ সাল থেকে এ দিবস পালনের সূচনা করে, যার লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক পর্যায়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য, বেকারত্ব, সামাজিক বঞ্চনা এবং মানবিক মর্যাদাহানির বিরুদ্ধে সমন্বিত সচেতনতা ও নীতিনির্ধারণী অঙ্গীকার সৃষ্টি করা। এই দিবসের দার্শনিক ও নীতিগত কাঠামো গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে United Nations–এর সামাজিক উন্নয়ন এজেন্ডায়, বিশেষত ১৯৯৫ সালের কোপেনহেগেন ঘোষণাপত্র ও ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে।
সামাজিক ন্যায়বিচার ধারণাটি কেবল আইনি সমতা বা আনুষ্ঠানিক অধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, সুযোগের সমতা, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর মধ্য দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি। এই তাত্ত্বিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করতে গেলে রাজনৈতিক দার্শনিক John Rawls–এর ন্যায়বিচার তত্ত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর “justice as fairness” ধারণা অনুযায়ী, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে বৈষম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সবচেয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করে। রলসের এই নীতিগত কাঠামো বিশ্বায়িত অর্থনীতির যুগে পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, যেখানে আয়ের বৈষম্য ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ।
বিশ্বায়নের যুগে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের রূপান্তর, অভিবাসন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে শ্রমের মর্যাদা ও সুরক্ষা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই প্রেক্ষাপটে International Labour Organization–এর “Decent Work Agenda” সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামাজিক সংলাপ—এসব উপাদান সামাজিক ন্যায়বিচারকে কেবল নৈতিক আহ্বান নয়, বরং নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে রূপ দেয়।
একই সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার আজ মানবাধিকার–ভিত্তিক উন্নয়ন ধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও বাসস্থানের অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) প্রথম লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন এবং দশম লক্ষ্য বৈষম্য হ্রাস—এই দুটিই সামাজিক ন্যায়বিচারের বাস্তব রূপায়ণ। ফলে World Day of Social Justice কেবল প্রতীকী স্মরণ নয়; এটি উন্নয়ন অর্থনীতির নীতিমালা, কল্যাণরাষ্ট্রের দর্শন এবং বৈশ্বিক নৈতিক দায়িত্ববোধের পুনর্বিবেচনার আহ্বান।
সামাজিক ন্যায়বিচার প্রশ্নে লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, প্রতিবন্ধকতা ও অভিবাসী–অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যুক্ত করেছে। বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মানে বহুমাত্রিক বৈষম্য চিহ্নিত করে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সামাজিক চেতনার পরিবর্তন ঘটানো। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি সামাজিক ন্যায়বিচার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার ধারণা বলছে, যারা সবচেয়ে কম দূষণ করেছে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পরিবেশ নীতি ও সামাজিক নীতি এখন আর পৃথক নয়; বরং আন্তঃসম্পর্কিত।
World Day of Social Justice তাই এক গভীর নৈতিক প্রতিজ্ঞা—একটি এমন বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণের অঙ্গীকার, যেখানে উন্নয়ন কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিমাপ নয়, বরং মানবমর্যাদা, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির পরিমাপ। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কোনো দান বা সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি একটি অধিকারভিত্তিক দাবি এবং টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
