বিতর্কে সাব-রেজিস্ট্রার মিনতি দাস, অভিযুক্ত স্বামীও
ফরিদপুরে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও জাল শিক্ষা সনদে চাকরির অভিযোগ
দিলীপ চন্দ, বিশেষ প্রতিনিধি : ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ, জাল শিক্ষা সনদ, জমি রেজিস্ট্রেশনে অনিয়ম, সম্পদ অর্জন ও সিন্ডিকেট — এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার মিনতি দাসকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে তার স্বামী পরিতোষ কুমার দাসের বিরুদ্ধেও।
দুদকের মামলা, নথি বিশ্লেষণ, মাঠ পর্যায়ের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়; বরং জমি রেজিস্ট্রেশন খাতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সনদ যাচাই প্রক্রিয়া ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
ভুয়া সনদ ও নিয়োগ বিতর্ক
তথ্য অনুযায়ী, মিনতি দাসের জন্ম ১৯৬৬ সালের ১৪ মার্চ। সে হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল প্রায় পাঁচ বছর। তবুও নিজেকে মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী ও মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, জাল সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে ২০১৭ সালে মিনতি দাস ও তার স্বামী পরিতোষ কুমার দাসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে তাদের শিক্ষা সনদ ও মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।অভিযোগে বলা হয়, ভুয়া সনদের মাধ্যমে চাকরি নিয়ে তারা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মিনতি দাস বর্তমানে দায়িত্বে থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
জমি রেজিস্ট্রেশনে কারসাজির অভিযোগ
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও কম মূল্যে দলিল রেজিস্ট্রি করে সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী — ভিটি শ্রেণির জমিকে নাল দেখিয়ে কম মূল্যে রেজিস্ট্রি পরে একই জমি বেশি মূল্য দেখিয়ে ব্যাংকে মর্টগেজ ফলে সরকার রাজস্ব হারালেও সংশ্লিষ্ট পক্ষ লাভবান ঢাকার পল্লবী ও গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে এমন একাধিক ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফরিদপুরেও দলিল লেখক, উমেদার ও অফিস স্টাফদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় — এমন অভিযোগ রয়েছে।
সম্পদ অর্জন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
মিনতি দাসের বিরুদ্ধে চাকরিতে যোগদানের পর স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয় — রাজধানীতে নামে-বেনামে ফ্ল্যাট ও প্লট একাধিক গাড়ি জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি আয় ও জীবনযাপনের অসামঞ্জস্য ফরিদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল রেজিস্ট্রেশনে অর্থের বিনিময়ে নিয়মনীতি উপেক্ষার অভিযোগও উঠেছে। কয়েক হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
দুদক তদন্ত ও নথি বিশ্লেষণ
যে প্রশ্নগুলো সামনে দুদক তদন্ত ও নথি বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে —
নিয়োগের সময় সনদ যাচাই কতটা কার্যকর ছিল অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন দৃশ্যমান হয়নি একই অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকেন কীভাবে রেজিস্ট্রেশন অনিয়ম অডিটে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ সীমিত ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্ত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান জবাবদিহিতা দুর্বল করে।
কারা লাভবান — সিন্ডিকেট কাঠামোর অভিযোগ অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জমি রেজিস্ট্রেশনকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক একটি সিন্ডিকেট কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ
দলিল লেখক ও উমেদার অফিস স্টাফ ও মধ্যস্বত্বভোগী ক্রেতা-বিক্রেতার একটি অংশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক বা ঋণ সংশ্লিষ্ট পক্ষ কম মূল্য দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করলে স্ট্যাম্প, ভ্যাট ও রেজিস্ট্রি ফি কম পড়ে। পরে বেশি মূল্য দেখিয়ে মর্টগেজ করলে ঋণ সুবিধা বাড়ে — এতে দ্বৈত সুবিধার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল যাচাই দুর্বল থাকলে এ ধরনের সিন্ডিকেট টিকে থাকে এবং এতে রাজস্ব ক্ষতি, বাজারমূল্যের বিকৃতি ও ব্যাংকিং ঝুঁকি তৈরি হয়।
বৃহত্তর প্রভাব: ব্যক্তি না কাঠামোগত সমস্যা?
অনুসন্ধান বলছে, অভিযোগগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলেও এর প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিক। বিশ্লেষণে সামনে এসেছে —সনদ যাচাই ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়মিত অডিটের ঘাটতি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি নিয়োগে ডিজিটাল সনদ যাচাই, সম্পদ বিবরণীর নিয়মিত অডিট এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভ্যালুয়েশন চালু করলে অনিয়মের সুযোগ কমতে পারে।
সাব-রেজিস্ট্রার মিনতি দাসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ— ভুয়া সনদ, জমি রেজিস্ট্রেশনে অনিয়ম, সম্পদ অর্জন ও সিন্ডিকেট— সব মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে: রেজিস্ট্রেশন খাতে জবাবদিহিতা কতটা কার্যকর।
অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ আদালত ও তদন্ত সংস্থার বিষয়। তবে অনুসন্ধান ইঙ্গিত করছে — সরকারি নিয়োগ যাচাই, অডিট, ডিজিটাল ভ্যালুয়েশন ও তদারকি শক্তিশালী না হলে একই ধরনের অভিযোগ পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিস্তৃত তদন্ত, নিয়মিত অডিট ও নীতিগত সংস্কারই পারে রেজিস্ট্রেশন খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
(ডিসি/এসপি/ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬)
