ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক নির্মাণ
ওয়াজেদুর রহমান কনক
ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে এটিকে কেবল ১৯৫২ সালের একটি রক্তাক্ত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; বরং এটি ছিল উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগঠন সংকট, সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিসত্তার সাংবিধানিক অধিকার প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার আদর্শগত ভিত্তি নির্মাণের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণ সংখ্যায় বেশি হলেও ক্ষমতার কাঠামো, সামরিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণী পরিসর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক। ভাষানীতি এই বৈষম্যের প্রথম সুস্পষ্ট রূপ হয়ে ওঠে।
ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তমদ্দুন মজলিস ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মতো সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালেই বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুর একমাত্র রাষ্ট্রভাষার পক্ষে বক্তব্য দিলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-এ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রদের মিছিল এবং পুলিশি গুলিবর্ষণের ঘটনা ইতিহাসে এক মোড়বদলের মুহূর্ত। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ শহীদদের আত্মত্যাগ ভাষা প্রশ্নকে নৈতিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করে। ভাষা তখন কেবল প্রশাসনিক স্বীকৃতির দাবি নয়, শহীদের রক্তে রঞ্জিত ন্যায়ের প্রতীক।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়; যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। অবশেষে ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা ও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় কেন্দ্র। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন একটি সাংবিধানিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিল—যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ নজির।
সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণে ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের রূপান্তরমূলক পর্যায়। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়। বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পচর্চা নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য পায়। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি কিংবা লোকসংস্কৃতি কেবল নান্দনিক অনুষঙ্গ নয়—এগুলো হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা। ভাষা এখানে একটি ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ (imagined community) নির্মাণের হাতিয়ার, যেখানে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনায় আবদ্ধ হয়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিতেও ভাষা প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক নিয়োগ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের সুযোগ নির্ধারিত হয়। বাংলা ভাষার স্বীকৃতি পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার বিস্তৃত করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি ভাষাভিত্তিক প্রকাশনা শিল্প, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অর্থনীতির বিকাশে সহায়ক হয়। ভাষা এখানে সাংস্কৃতিক পুঁজি হিসেবে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভাষা আন্দোলন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক পূর্বসূরি। ভাষার প্রশ্নে যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, সেটিই পরবর্তীকালে স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়। ভাষা আন্দোলন বাঙালির আত্মপরিচয়ের কাঠামো নির্মাণ করে; এই পরিচয় ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। সেই অর্থে ভাষা আন্দোলন ছিল একটি জাতির আত্ম-উদ্ভবের মুহূর্ত।
অতএব, ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য বহুমাত্রিক—সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক। এটি কেবল অতীতের স্মারক নয়; এটি বর্তমানের গণতান্ত্রিক চর্চা, সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা এবং ভাষাগত ন্যায়বিচারের স্থায়ী ভিত্তি। বাংলা ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; এটি ইতিহাস নির্মাণের শক্তি।
বাংলা ভাষা আন্দোলন কেবল একটি ভাষাগত অধিকার রক্ষার সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগঠনের সংকট, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন রাষ্ট্রের বীজরোপণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও শাসনক্ষমতার কেন্দ্রে স্থাপিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, আর জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ—পূর্ব বাংলার বাঙালিরা—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে প্রান্তিক অবস্থানে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালে Muhammad Ali Jinnah ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণা ভাষাগত প্রশ্নকে রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতীকে রূপান্তরিত করে। ফলে ভাষা প্রশ্নটি হয়ে ওঠে ক্ষমতা, পরিচয় এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই দেখতে হয় ভাষা ও জাতিসত্তার সম্পর্ক। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও মানসিক জগতের বাহন। পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে বাংলা ছিল সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, সংগীত, ধর্মীয় ও সামাজিক চর্চার প্রধান অবলম্বন। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাগত পরিচয়কে অস্বীকার করার সামিল। ফলে ভাষা আন্দোলন দ্রুত সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার সংগ্রামে রূপ নেয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের রক্তদানের ঘটনা ভাষাকে জাতীয় আত্মত্যাগের প্রতীকে উন্নীত করে। এই আত্মত্যাগের স্মৃতি পরবর্তীকালে জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
সাংস্কৃতিক পরিসরে ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করে। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার পরিবর্তে ভাষাভিত্তিক ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তার ধারণা শক্তিশালী হয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখ সাহিত্যিকদের ঐতিহ্য নতুন করে আত্মস্থ হয়; বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক মুক্তির প্রতীক। ফলে জাতীয়তাবাদের কেন্দ্র সরে যায় ধর্মীয় পরিচয় থেকে ভাষাগত-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দিকে। এই রূপান্তর ছিল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
ভাষা আন্দোলনের আরেকটি তাৎপর্য নিহিত রয়েছে রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্পর্কের পুনর্নির্মাণে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের সংগঠিত প্রতিরোধ দেখিয়েছে যে নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের নীতিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং ন্যায়সংগত দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্র, আর ছাত্ররাজনীতি হয়ে ওঠে জাতীয় রাজনীতির চালিকাশক্তি।
সবশেষে বলা যায়, ভাষা আন্দোলন ছিল একটি ঐতিহাসিক চেতনার উন্মেষ, যেখানে ভাষা হয়ে ওঠে স্বাধীনতার পূর্বভূমিকা। এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি এবং রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক সমন্বিত অধ্যায়। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য তাই কেবল ১৯৫২ সালের ঘটনাবলিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা, রাজনৈতিক দর্শন এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের ভিত্তিপ্রস্তর।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
