জমি রেজিস্ট্রি করতে গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা
হাবিবুর রহমান, ঝিনাইদহ : জমি ক্রয়-বিক্রয় মানুষের জীবনের বড় বিনিয়োগগুলোর একটি। কিন্তু সেই জমি রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের। এ ধরণের ঘটনা ঘটেই চলেছে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে। দলিল লেখক, দালাল ও অফিস-সংশ্লিষ্ট কতিপয় অসাধু চক্রের কারণে জমি রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল ও ভোগান্তিপূর্ণ।
জানা গেছে, জমির মূল্য ও সরকারি নির্ধারিত ফি অনুযায়ী রেজিস্ট্রি খরচ নির্দিষ্ট থাকলেও বাস্তবে তা দিতে হচ্ছে আরও কয়েকগুণ বেশি। কখনো দলিল দ্রুত সম্পন্ন করা, কখনো নথি যাচাই বা সই নেওয়ার অজুহাতে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। অনেক ক্ষেত্রে টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা বা ভুলত্রুটি দেখিয়ে হয়রানি করা হয় জমির ক্রেতা-বিক্রেতাদের। দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ওয়াজেদ আলী খার নেতৃত্বে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে হরিণাকুণ্ডু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রামরাজত্ব কায়েম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এমনকি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রারের নাম ব্যবহার করে এই অর্থ আদায় করা হলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না জমি ক্রেতা বিক্রেতারা।
সূত্র জানায়, রেজিস্ট্রি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ওয়াজেদ আলী একটি চক্র গড়ে তোলে। চক্রটি ভুয়া দলিল রেজিস্ট্রিসহ নানা অনিয়ম করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। চক্রটি যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন তাদের ব্যবহার করে থাকে ফলে অনেকে প্রকাশ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে মুখ খোলে না।
আদর্শ আন্দুলিয়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘দালাল ছাড়া রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো কাজই হয় না। আমার ৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি জমি রেজিস্ট্রি করতে সরকারি ফি ছাড়াও অন্তত ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে। টাকা না দিলে কাজ হচ্ছিল না তাই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি।’
নারায়নকান্দি গ্রামের লিয়াকত আলী বলেন, ‘আমার শ্বাশুড়ীর নামে থাকা জমি স্ত্রীর নামে হস্তান্তরের পর বিক্রির সময় কাগজপত্রে নানা ত্রুটির কথা বলে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে বড় অঙ্কের টাকা না দিলে এ অফিসে কোনো কাজ হয় না। রেজিস্ট্রির দিন বিপুলসংখ্যক মানুষ জমি রেজিস্ট্রি করতে এলে তাদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন ওয়াজেদ আলীর নেতৃত্বে সঙ্ঘবদ্ধ চক্র। এ নিয়ে অনেকবার ইউএনও অফিসে জানিয়ে কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনির্ধি আয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, ‘হরিণাকু-ু সাবরেজিস্ট্রি অফিসে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিক তদন্ত ও প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নইলে জমি রেজিস্ট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে সাধারণ মানুষ হয়রানি ও অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়তেই থাকবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘সারাদেশে যেভাবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস পরিচালনা করা হয়। আমরা এখানে সেভাবেই পরিচালনা করে থাকি। অফিস পরিচালনার জন্য দাতা-গ্রহীতাদের কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা নেওয়া হয়।’
হরিণাকুন্ডু সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের সাবরেজিস্টার মোমিন মিয়া বলেন, আমাদের এখানে সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়া অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ এ ধরণের কর্মকা-ে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ব্যাপারে হরিণাকু-ু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিদারুল আলম বলেন, বিষয়টি শুনেছি। আমাদের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাসিক আইনশৃঙ্খলায় সভায় এ নিয়ে সকলকে সর্তক করা হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।’
(এইচআর/এসপি/ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬)
