একুশ থেকে একাত্তর: চেতনার মহাকাব্য ও স্বাধীন বাংলাদেশ
মানিক লাল ঘোষ
বাঙালির ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে ৫২ এবং ৭১ কেবল দুটি সংখ্যা নয়, বরং একটি অবিনাশী চেতনার নাম। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে যে রক্তস্রোত বয়ে গিয়েছিল, তা মূলত ছিল একটি পরাধীন জাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম হুংকার। সেই হুংকারই কালক্রমে বজ্রকণ্ঠে পরিণত হয়ে ১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম দেয় এক নতুন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।
পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়, তখন বাঙালি বুঝতে পেরেছিল যে এটি কেবল ভাষার ওপর আঘাত নয়, বরং একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে তার নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক মূল চিনিয়ে দিয়েছিল। ধর্মের ভিত্তিতে হওয়া কৃত্রিম বিভাজন ছাপিয়ে 'বাঙালি' পরিচয়টিই প্রধান হয়ে ওঠে। এই সাংস্কৃতিক জাগরণই ছিল পরবর্তীকালে রাজনৈতিক স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম সফল গণবিস্ফোরণ। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের আত্মত্যাগ সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দেয় যে, বুকের রক্ত দিয়ে হলেও অধিকার আদায় সম্ভব। এই আত্মবিশ্বাসই ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটায় এবং বাঙালির মনে স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন বুনে দেয়।
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে, যিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছে দেন।
১৯৬৬-এর ছয় দফা: যা ছিল বাঙালির 'মুক্তির সনদ', তার নেপথ্য শক্তি ছিল একুশের চেতনা।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান: আইয়ুব শাহীর পতনের মূলে ছিল সেই একই ছাত্র-জনতার ঐক্য, যা ৫২-তে দানা বেঁধেছিল।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ: ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যে অকুতোভয় সাহস আমরা দেখেছিলাম, তার মানসিক রসদ যোগাত 'অমর একুশে'র গান ও চেতনা।
একুশের চেতনা আমাদের শিখিয়েছিল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে। ভাষা আন্দোলনে যেমন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল সব ধর্মের মানুষ, তেমনি একাত্তরেও সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাই ছিল প্রধান হাতিয়ার। একুশ শিখিয়েছে মাথা নত না করতে, আর একাত্তর শিখিয়েছে শেকল ভাঙতে।
একুশ মানেই একাত্তরের ভ্রূণ। বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি যদি বাঙালিকে কথা বলতে না শেখাত, তবে একাত্তরের মার্চে আমরা 'জয় বাংলা' বলে গর্জে উঠতে পারতাম না। আজ আমরা যে স্বাধীন ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে নিজের ভাষায় কথা বলছি, তার প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে বায়ান্নর আবেগ আর একাত্তরের বীরত্ব। একুশ আমাদের শেকড়, আর একাত্তর আমাদের আকাশ। "একুশ আমার চেতনা, একাত্তর আমার ঠিকানা।"
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
