আবদুল হামিদ মাহবুব


আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান সমীপে আমি অল্প কথা বলতে চাই। সংবাদপত্রের খবর মারফত জেনেছি আপনি মন্ত্রণালয়ে প্রথম কর্মদিবসে (বুধবার,১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে এক পরিচিতি সভায় বলেছেন, 'বিচারপতি মানেই সৎ। ‘সৎ বিচারপতি’ বলে আলাদা কোনো সংজ্ঞা নেই। বিচারক শব্দটার সাথেই সততার বৈশিষ্ট্য জড়িত। আমি বিচারকদের ক্ষেত্রে সৎ বা অসৎ- এই বিভাজন দেখতে চাই না। বিচারক মানেই তাকে সৎ হতে হবে।'

আপনি এও বলেছেন, 'যাদের মনে হবে সরকারি চাকরিতে যে বেতন পাওয়া যায়, তাতে তাদের সংসার চলছে না বা এই আয়ে পোষাবে না, তাদের জোর করে চাকরি করার দরকার নেই। তারা চাইলে ওকালতি করতে পারেন। কারণ বিচারকদের অবসরের পর ওকালতি করার আইনি সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পদে থেকে দুর্নীতি করা কোনোভাবেই গ্রহণ করা হবে না। এটা আমার কমন ম্যাসেজ।’

আপনার এই কথাগুলো খুবই চমৎকার। কারণ মানুষ আশাবাদী হওয়ার মত এইসব কথা। কর্মকর্তাদের সৎ থাকার পথে আপনি কি পদক্ষেপ নেন সেটা দেখতে আপনাকে সময় দিতে হবে। অবশ্যই আমরা সময় দেব। আপনার আওতাধীন অন্যক্ষেত্র নিয়ে আমি কিছু কথা তুলে ধরতে চাই।

আপনি বলেছেন, ওকালতি করার আইনি সুযোগ রয়েছে। ওকালতিতে কি ইচ্ছা মাফিক টাকা আদায় করা বৈধ? অথবা আইনসিদ্ধ? সাধারণ মানুষ নিরুপায় হয়ে আইনের আশ্রয় নেয়। আইনের আশ্রয় নিতে হলেই তাকে একজন আইনজীবী নিয়োগ দিতে হয়। সেই আইনজীবী অসহায় হয়ে আসা মানুষটার কাছ থেকে কি ইচ্ছা মত ফি আদায় করে নিতে পারেন? এই ক্ষেত্রে কি কোন বিধান করা যায় না? আইনজীবীদের ফি নির্ধারণের কি কোন পদ্ধতি ঠিক করা সম্ভব নয়?

আইনমন্ত্রী সাহেব আপনি নিজে একজন খ্যাতনামা আইনজীবী ছিলেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।সরকারি আইনজীবীদের জন্য কিন্তু ফি নির্ধারিত করা আছে। মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে নিশ্চয়ই আপনি সেই ফির বাইরে কোন টাকা পান নাই। এই প্রসঙ্গ ধরেই আমি আমার কথাটা উপস্থাপন করছি।

এখন আপনি সংসদ সদস্য হয়ে নীতি নির্ধারণী ফোরামে যেতে পেরেছেন। আর সেই সুবাদে পুরো আইন বিভাগ সবকিছু একটা শৃংখলায় আনার জন্য, তার উন্নয়নের জন্য, আপনার কাঁধে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পড়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ আশা রাখতে চাই; কেবল বিচারাঙ্গনের কর্মকর্তা-কর্মচারী বিচারকবৃন্দই নয়, এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে দুর্নীতিমুক্ত করবেন।

আমি আশা রাখতে চাই আইনজীবী ও তাদের সহযোগীদের (মোহরী) জন্য বিধান করে ফি নির্দিষ্ট করে দেবেন। তাহলে অযথা ভোগান্তির শিকার হবে না বিচারপ্রার্থী মানুষ। হয়তো আপনি এটা করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে বাধার সম্মুখীন হবেন। পৃথিবীর দেশে দেশে আইনজীবীরা কিভাবে ফি নিচ্ছে, সেসব বিষয় সামনে আসবে। আমি বলব, সব কিছু ডিঙিয়ে আপনি যদি আমাদের দেশে নির্দিষ্ট ফি-এর প্রচলন করতে পারেন, তবে সারাবিশ্বে সেটা উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।

আপনি অবহিত আছেন কিনা জানিনা, আমাদের দেশে মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে অনেকে ফতুর হয়েছে। একজন আইনজীবী তার পরিচালনার সাধ্যের অধিক মামলা নিজের হাতে রাখায় দিনের পর দিন তারিখ ফেলেন। মক্কেলরা তারিখে তারিখে আইনজীবীর কাছে ধরনা দেন। কিন্তু আদালতে মামলার শুনানি হয় না। তারপরও আইনজীবীকে ঠিকই ফি দিয়ে যেতে হয়। আমার রিপোর্টিং জীবনে এমন অনেক মানুষ পেয়েছি, বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় কেবলই ঘুরছেনই, মামলার কোন সুরাহা হচ্ছে না। কিন্তু উকিল মোহরীদের অবিরাম টাকায় দিয়ে যাচ্ছেন। এই সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অন্তত একটা কিছু করা যায়। আর সেই 'যায়' শব্দটার উপর জোর দিয়ে আপনার কাছে ভরসা নিয়ে বলছি, অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে হোক না একটা নতুন পথ। সেই পথের সূচনা হোক আপনার হাত ধরে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যক।