তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জে রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। কাঁচা বাজারে এ উত্তাপ সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ফল, মাংস, মাছের বাজারেও উত্তাপের কমতি নেই। এসব পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। হঠাৎ করেই বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে নাভিশ্বাস উঠেছে। গত সপ্তাহের তুলনায় অনেক পণ্যের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রোজার শুরুতেই ভোক্তাদের জন্য বাড়-বাড়ন্তের চাপ তৈরি করেছে।

গোপালগঞ্জ শহরের বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের শুরুতে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও তাদের মুখে স্বস্তির বদলে ছিল উদ্বেগ ও হতাশা। অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম পণ্য কিনে বাজেট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা কাটছাঁট করছেন।

গোপালগঞ্জ শহরের বড়বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে যে বেগুন ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, তা রোজার প্রথম দিকেই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১০ টাকায়। একইভাবে ৬০ টাকার শশা বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। লেবু প্রকারভেদে প্রতি হালি ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় দাম বাড়ছে। তবে ক্রেতারা এ যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, রোজা এলেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেন। রমজানের অন্যতম প্রধান পণ্য খেজুরের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। প্রতি কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মুরগি ও গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা। অন্যদিকে, ৯০ টাকায় বিক্রি হওয়া গরুর দুধ এখন বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। ফলে সেহরি ও ইফতারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

বাজারে আসা অনেক ক্রেতাই জানিয়েছেন, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সমন্বয় করতে পারছেন না। রোজার সময় পরিবারে খরচ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তার ওপর যদি প্রতিটি পণ্যের দাম এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা মন্তব্য করেছেন।

শহরের পাচুড়িয়া এলাকার বাসিন্দা ও রমজানের নিত্য পণ্য ক্রেতা হামিম শেখ বলেন, “গত সপ্তাহে যে টাকায় পুরো বাজার করেছি, আজ সেই টাকায় অর্ধেক জিনিসও পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে।বিশেষ করে লেবু, শশা, বেগুন, মুরগি, মাছ ও গরুর মাংসের দাম বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।”

আলিমুল ইসলাম নামের আরেকজন ক্রেতা জানান, “ খেজুর, মাল্টা, আপেল, দুধ সহ প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য যদি এভাবে বাড়তেই থাকে, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে রোজা পালন করাও কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এদিকটা একটু সবার নজর দেওয়া দরকার। ”

বাজারের নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করেছেন জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আরিফ হোসেন। তিনি জানান, রমজানকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য বাজারে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে জেলা পর্যায়ে আলোচনা করেছি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ভোক্তা হামজা মোল্লা বলেন, শুধু অভিযান নয়, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, পাইকারি বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং অসাধু মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে রমজানের পুরো সময়জুড়েই বাজার অস্থির থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড.মোঃ হাফিজুর রহমান বলেছেন, শুধুমাত্র বাজার মনিটরিং করেই রাজার দর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত, ব্যবসায়ীদের মানবিক মূল্যবোধ ও সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি ইমাম, প্রবীণ সহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। সবাই সচেতন হলে এ অবস্থার উত্তরণ ঘটনানো সম্ভব হবে।

(টিবি/এসপি/ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬)