কার্বন সীমান্ত রাজনীতি
ইইউ সিবিএএম ও বাংলাদেশের রপ্তানি: বাজার থাকবে, নাকি বদলে যাবে?
মো. ইমদাদুল হক সোহাগ
আগামী দিনের বিশ্ববাণিজ্যে শুধু কম দাম আর ভালো মান দিয়ে এগিয়ে থাকা কঠিন হবে। ক্রেতারা আজ থেকেই নতুন এক প্রশ্ন তুলছে—এই পণ্যটি তৈরি করতে গিয়ে মোট কতটা কার্বন নিঃসরণ হয়েছে? বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: অর্ডার পেতে হলে এখন পণ্যের ট্যাগের পাশাপাশি দরকার একটি বিশ্বাসযোগ্য ‘কার্বন পরিচয়পত্র’—যা দেখাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং কতটা টেকসই।
শোনাতে এটি নিছক পরিবেশবাদী স্লোগান মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি বিশ্ববাজারের নতুন পাসপোর্ট। আর এই পাসপোর্টের প্রাতিষ্ঠানিক নাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM)। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এর অর্থ একটাই—কার্বন এখন আর শুধু পরিবেশনীতি নয়; এটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার নতুন ক্ষমতা। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই নিয়মকে কেবল চাপ হিসেবে দেখবে, নাকি এটাকে প্রতিযোগিতার নতুন সুবিধায় রূপ দিতে পারবে?
সিবিএএম: নিয়ম, নাকি অদৃশ্য দেয়াল?
সিবিএএম-এর মূল ধারণা হলো—ইইউ বাজারে প্রবেশ করা পণ্যের এম্বেডেড কার্বন (উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মোট নিঃসরণ) হিসাব করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যাতে ইইউর ভেতরের কার্বন-খরচ এবং আমদানির কার্বন-খরচের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক না থাকে। ঘোষিত উদ্দেশ্য কার্বন লিকেজ ঠেকানো—যাতে নিঃসরণ বাস্তবে কমার বদলে শুধু উৎপাদনের জায়গা বদলায় না।
প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি কার্বন-ঘন খাতকে লক্ষ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ হয়তো ভাবতে পারে—আমাদের প্রধান রপ্তানি তো তৈরি পোশাক, তাই এখনই উদ্বেগ কেন? কিন্তু ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলো—এ ধরনের কাঠামোর প্রভাব কেবল একটি খাতেই আটকে থাকে না। নীতি-পরিধি ও করপোরেট সাপ্লাই চেইনের মানদণ্ড সময়ের সঙ্গে বদলায়। ইউরোপ যেহেতু আমাদের অন্যতম বড় বাজার, তাই কার্বন কমপ্লায়েন্সকে “ভবিষ্যতের বিষয়” বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কমছে।
আর বাস্তবে পরিবর্তনটা অনেক সময় নীরবে আসে—কোনো দিন হঠাৎ করে ক্রেতা বলবে না, “আপনি এখন থেকে সিবিএএমের আওতায়”; বরং সে বলবে, “পরের অর্ডারের আগে কার্বন ডেটা দিন, অডিট রিপোর্ট দিন, এনার্জি মিক্সের ব্যাখ্যা দিন।” অর্থাৎ, আইন নয়—প্রোকিউরমেন্ট (ক্রয় নীতি) দিয়েই বাজার আগে বদলায়। এই ‘শান্ত পরিবর্তন’ বুঝতে পারা মানে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া; আর না বুঝতে পারা মানে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়ানো।
সবুজ নীতি যখন নব্য-সংরক্ষণবাদ
সবুজ নীতি এখন আর কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এটি কঠিন রাজনীতির অংশ। অনেক উন্নয়নশীল দেশের যুক্তি—কার্বন-ভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থা অনেক সময় সবুজ সংরক্ষণবাদ হয়ে ওঠে: পরিবেশ রক্ষার ভাষায় বাজারে ঢোকার নতুন বাধা। বাংলাদেশের অবস্থান এখানে দ্বিমুখী। আমরা জলবায়ু ঝুঁকিতে সামনের সারিতে, কিন্তু বৈশ্বিক নিঃসরণে আমাদের অবদান তুলনামূলকভাবে নগণ্য। ফলে ন্যায্যতার প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
তবু ন্যায্যতার বিতর্কের বাইরে বাজার এখন প্রমাণ-নির্ভর। ইউরোপীয় ক্রেতা, বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক—সবাই এখন একটাই জিনিস চায়: ডেটা। কার্বন প্রোফাইল যাচাই করতে না পারলে দাম বা মান—কোনোটিই শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা দেয় না। প্রতিযোগিতা তাই সস্তা শ্রমের সুবিধা থেকে সরে গিয়ে প্রযুক্তি, জ্বালানি সক্ষমতা এবং তথ্য-স্বচ্ছতার দিকে মোড় নিয়েছে। এই বদল মিস করা মানে শুধু অর্ডার হারানো নয়—ধীরে ধীরে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়া। আজকের বাজারে ‘কমপ্লায়েন্স রিস্ক’ এক ধরনের বাণিজ্যিক ঝুঁকি, যা কেবল আইন দিয়ে নয়—ক্রেতার চাহিদা দিয়েই অনেক সময় নির্ধারিত হয়।
তথ্যস্বচ্ছতা ছাড়া বাজারে বিশ্বাস নেই
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে তথ্যঘাটতি। নতুন বাস্তবতায় শুধু মানসম্পন্ন পণ্য পাঠালেই হবে না; প্রমাণ করতে হবে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে কত নিঃসরণ হয়েছে—এবং সেই হিসাব হতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও যাচাইযোগ্য। সেন্সর-ভিত্তিক এনার্জি মনিটরিং, মানসম্মত হিসাবপদ্ধতি এবং নিরপেক্ষ নিরীক্ষা—এসব ছাড়া কার্বন রিপোর্ট বাজারে বিশ্বাসযোগ্য হয় না।
এখানে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি অপরিহার্য। পরিবেশ অধিদপ্তর, কাস্টমস ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ এবং মানসম্মত MRV (মেজারমেন্ট–রিপোর্টিং–ভেরিফিকেশন) কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। তথ্য দুর্বল হলে আমদানিকারক পক্ষ উচ্চতর ডিফল্ট মান ধরে বাড়তি খরচ বসাতে পারে—আর আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব। সুতরাং ডেটা ব্যবস্থাপনা এখানে কেবল রিপোর্টিং নয়; এটি বাজারে দরকষাকষির সক্ষমতা।
একটি বাস্তব উদাহরণ ভাবুন: একই ধরনের পণ্য দুই দেশ থেকে ইউরোপে যাচ্ছে। এক দেশ কার্বন ডেটা নির্ভুলভাবে দেখাতে পারছে—কোন ইউনিটে কত বিদ্যুৎ, কোন উৎস থেকে, কীভাবে দক্ষতা বাড়িয়েছে, কোন অডিটে ভেরিফাই হয়েছে। অন্য দেশ “আনুমানিক” হিসাব দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ক্রেতা ঝুঁকি কমায় কোথায়? যেখানে ডেটা স্পষ্ট। দাম সামান্য বেশি হলেও অর্ডার সেখানে যেতে পারে—কারণ ক্রেতার কাছে এখন ঝুঁকি মানে শুধু ডেলিভারি নয়, কমপ্লায়েন্স রিস্কও। অর্থাৎ, “কম খরচ” নয়—“কম ঝুঁকি” অনেক সময় বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।
ব্যাংকিং: রূপান্তরের চালিকাশক্তি
কার্বন কমানো মানে বিনিয়োগ—জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়া। অর্থাৎ দরকার সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। এখানে ছোট ও মাঝারি শিল্প (SME) সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে—কারণ তাদের সক্ষমতা সীমিত, কিন্তু চাহিদা এক। SME বাদ পড়লে পুরো সাপ্লাই চেইনই দুর্বল হবে। তাই সবুজ রূপান্তরকে “এলিট ক্লাব” না বানিয়ে সবার জন্য সম্ভব করতে হলে অর্থায়নের পথ সহজ করতে হবে।
এখানেই ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা নির্ধারণী। গ্রিন ফাইন্যান্সিংকে শুধু নীতিপত্রে না রেখে বাস্তবে আনতে হবে—দীর্ঘ মেয়াদের ঋণপণ্য, জলবায়ু-ঝুঁকি বিবেচনা, এবং রূপান্তর-সহায়ক ফাইন্যান্সিং দিয়ে। ব্যাংকগুলোকে কেবল ঋণদাতা নয়, উদ্যোক্তাদের কৌশলগত অংশীদার হতে হবে। কারণ অর্থায়নের গতি থেমে গেলে থেমে যাবে রূপান্তর—আর রূপান্তর থেমে গেলে ক্ষতিটা যাবে বাজারে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো চাইলে পারফরম্যান্স-লিঙ্কড ঋণপণ্যও আনতে পারে—যেখানে যাচাইযোগ্যভাবে কার্বন কমাতে পারলে সুদ কমবে বা শর্ত সহজ হবে। এতে উদ্যোক্তার জন্য লক্ষ্যটা “ম্যান্ডেট” নয়, “ইনসেনটিভ” হয়ে দাঁড়ায়।
জ্বালানি নীতি ও কূটনীতি: একই মুদ্রার দুই পিঠ
একটি কারখানা একা যতই দক্ষ হোক, জাতীয় গ্রিড যদি কার্বন-ঘন হয়, তাহলে পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর একটি সীমা থেকে যায়। তাই শিল্পাঞ্চলে রুফটপ সোলার, গ্রিড কানেক্টিভিটি, এবং এনার্জি এফিসিয়েন্সি দ্রুত বাড়াতে হবে। জ্বালানি রূপান্তর এখানে কেবল পরিবেশনীতি নয়—এটি সরাসরি রপ্তানি প্রতিযোগিতার নীতি। উৎপাদনের খরচ কমানো, জ্বালানির অনিশ্চয়তা কমানো, এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো—এই তিনটি লাভ একসঙ্গে আসে।
একইসঙ্গে কূটনৈতিক ফ্রন্টে বাংলাদেশকে আরও সংগঠিত হতে হবে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে আমরা ন্যায্যতার দাবি তুলতে পারি। কিন্তু লক্ষ্য যেন শুধু আপত্তিতে আটকে না থাকে। সিবিএএমকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি হস্তান্তর, রূপান্তর সহায়তা, এবং ক্যাপাসিটি বিল্ডিং—এসব আদায়ে বাস্তব আলোচনার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই হবে বুদ্ধিমত্তা। ইউরোপকে বোঝাতে হবে—বাংলাদেশকে সবুজ করা মানে তাদের সাপ্লাই চেইনের স্থিতিশীলতাও বাড়ানো।
সিবিএএম কোনো সাময়িক ঝড় নয়; এটি বিশ্ববাণিজ্যের নতুন দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা। বাংলাদেশ চাইলে প্রস্তুতি ছাড়া পুরোনো ছকে চলতে পারে—ফলে বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। অথবা এখনই তথ্যস্বচ্ছতা, প্রযুক্তি, ব্যাংকিং, জ্বালানি নীতি ও কূটনীতিকে এক সুতোয় গেঁথে সবুজ রপ্তানি সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে—যা বাজার বাঁচাবে, সুযোগও তৈরি করবে।
এখনই তিনটি কাজ দ্রুত ফল দিতে পারে: ১) রপ্তানিখাতে কার্বন ডেটা ও এমআরভি-র জন্য কেন্দ্রীয় কাঠামো; ২) ব্যাংকিং খাতে গ্রিন ফাইন্যান্সিংকে বাস্তব ঋণপণ্যে রূপান্তর; ৩) শিল্পাঞ্চলে এনার্জি এফিসিয়েন্সি ও রুফটপ সোলার দ্রুত বিস্তার।কার্বন দক্ষতা এখন বাণিজ্য ক্ষমতার নতুন মুদ্রা। প্রশ্ন আর শুধু “কত রপ্তানি”—নয়; প্রশ্ন হলো —কতটা স্বচ্ছ ও সবুজ উপায়ে আমরা রপ্তানি করছি।
লেখক:ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতি-কলামিস্ট।
