আবদুল হামিদ মাহবুব


এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে অভিনব ঘটনা ঘটল। অভিনব এই কারণে বলছি, এটা তো আগে আর ঘটেনি।  ঘটে যাওয়া এই ঘটনার মধ্যে অভিনবত্ব ছিল। সেটা তেমন কিছু না, শহীদ মিনারে মোনাজাত। 

শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর, আমাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। একজন মাওলানা সেই মোনাজাত পরিচালনা করেছেন। মাইকে আমরা সবাই সেটা শুনলাম। টেলিভিশনে লাইভ দেখানোয় আমি আমার ঘরে থেকেও সেই মোনাজাতে শরিকও হয়েছি।

তারপর এলেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান। তিনি অবশ্য সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় আচার পালনের জন্য শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসেছেন। তার সাথে সংসদের বিরোধী দলীয় চিপ হুইপ এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম-সহ আরো কয়েকজন ছিলেন। তারাও শহীদ মিনার বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে হাত তুলে দোয়া করলেন। পুরো বিষয়টাই আমার কাছে অভিনব এবং আশ্চর্যান্বিত হবার মত ছিলো। কারণ ইতোপূর্বে কখনো শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পর এইভাবে মোনাজাত কিংবা দোয়া করা হয়েছে, অন্তত আমার স্মৃতিতে সেটা নেই। নতুন একটা সংস্কৃতি চালু হলো! নিশ্চয়ই এই সংস্কৃতি চলমান থাকবে।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সময়; সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর, যারা প্রাণ দিয়েছিলেন; তারা সকলেই ছিলেন মুসলিম। তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া তো করাই যায়। তবে আমি ভেবে কুল পাচ্ছি না! এতদিন কেন তাদের জন্য মাগফেরাত চাওয়া হলো না? অতীতে যারা শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিয়েছেন, তারাও তো মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন। এটা তো শুরু হয়েছে সেই পাকিস্তান আমল থেকে। সেই আমলে তো এই ভূখণ্ডে ইসলামের চর্চা আরো বেশি ছিল। যাক, বিলম্বে হলেও আমাদের মুসলমান ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফেরাতের জন্য দোয়ার প্রচলনটা শুরু হলো।

আমি আমার ছোটবেলার স্মৃতির কথা বলি। আমি প্রথম প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে গিয়েছি ১৯৭২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি। তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। সদ্য স্বাধীন দেশে আমাদের স্কুলে (মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) স্বেচ্ছাশ্রমে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করেছিলেন নবম দশম শ্রেণীর বড় ভাইয়েরা। পরে সেটা স্থায়ী করা হয়েছিল। ওই সময় আমি মাত্র স্কুল শুরু করেছি। বড় ভাইদের নির্দেশনা মত আরো অনেকের সাথে আমিও তাদেরকে এটা ওটা এগিয়ে দিয়ে সহায়তা করেছি। যদিও আমি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৭১ সালে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কারণে এক বছর স্কুল জীবন পিছিয়ে যায়। যুদ্ধকালীন সময়ে আমরা শহর ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করেছি।

১৯৭২ সালের সেই প্রভাতফেরিতে দেখেছিলাম, আমাদের উপরে ক্লাসের সৈয়দ মোসাহিদ আহমদ চুন্নুভাই তার গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি সেই অমর গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' গেয়ে গেয়ে আগে হাঁটছেন। তাঁর সাথে ছিলেন মিয়া মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন, আবদুল ওয়াহেদ মোশাহিদ-সহ (স্মৃতি থেকে লিখছি। ভুলও হতে পরে) উপরের ক্লাসের আরো অনেক।

আর আমরা তাদের সাথে গলা মিলিয়ে দলবেঁধে পেছন পেছনে হেঁটেছি। আমরা তখন নগ্ন পায়ে (খালি পায়ে) সারা শহর প্রদক্ষিণ করে শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিয়েছিলাম। নবনির্মিত শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার আগে হঠাৎ দেখলাম আমাদের স্কুলেরই কোন এক ছাত্র (উপরের ক্লাসের) ধোঁয়া উড়ছে একটি মাটির হাঁড়ি নিয়ে শহীদ মিনারের চারপাশ চক্কর দিলেন। সেই ধোঁয়া আমাদের নাকে যখন এসে লাগল তখন বেশ সুগন্ধই পেলাম। অনেক পরে জেনেছিলাম ওটা ছিল ধূপ-ধুনার ধোঁয়া।

আমাদের ওই শহীদ মিনারটি ছিল স্কুলের মূল ক্যাম্পাসের ভেতরে। বর্তমানে সেটির অস্তিত্ব নেই। কিভাবে সেটা বিলুপ্ত হয়েছে আমি বলতে পারব না। শহীদ মিনারে পুস্পার্ঘ্য অর্পণ করে আমরা সবাই সামনে দাঁড়াতাম। শহীদ বেদীতে বড় ভাই কেউ দাঁড়িয়ে আমাদেরকে ডান হাত উঁচু করিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করাতেন। সেই শপথে থাকতো, 'ভাষা শহীদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। আমরা জীবন দিয়ে হলেও বাংলা ভাষার মান রক্ষা করব।' ইত্যাকার ধরনের কিছু বাক্য।

আমাদের ছোটকালে এখন যেমন শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে, সেরকম ছিল না। সেই সময়ে শহরের লোকজনও খুব কম ছিল। শহরটা প্রায় গ্রামের মতোই ছিল। ষোল ডিসেম্বরের বিজয় দিবস ও ছাব্বিশে মার্চের স্বাধীনতা দিবসে তখনও শহীদ মিনার কিংবা স্মৃতি স্তম্ভে ফুল দেওয়ার রেওয়াজ চালু হয়নি। ওই দুই দিবসে আমাদের স্কুলের মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন হতো। আরও হতো স্কাউট, গার্লস গাইড, কাব ও শিশু সংগঠনের ছেলে মেয়েদের কুচকাওয়াজ শারীরিক কসরত ইত্যাদি।

মহান শহীদ দিবসে শহীদ মিনারে কেবল ফুল দিতাম আমরা। অর্থাৎ, মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছেলেরা। আর দিতেন মৌলভীবাজার মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। আমরা দিতাম আমাদের স্কুলের শহীদ মিনারে। আর মহাবিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা দিতেন তাদের প্রতিষ্ঠানের শহীদ মিনারে।

মৌলভীবাজার শহরের বর্তমান মেয়র চত্ত্বরের ওখানেও একটি শহীদ মিনার ছিল। এক দুটি সংস্কৃতিক সংগঠন সেই শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতেন। মেয়র চত্বরের নাম পূর্বে ছিল মৌলভীবাজার শিশু পার্ক। তবে একসময় মৌলভীবাজার মহাবিদ্যালয়ের শহীদ মিনারটি বেশ প্রশস্ত করে পূন:নির্মাণ করার পর ওইটা হয়ে যায় মৌলভীবাজারবাসীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেরও পরিবর্তন ঘটেছে।

ছোটবেলায় আমাদের কাছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবসটি ছিল শোকের দিবস। প্রভাতফেরির সামনে থাকতো কালো পতাকা। আমাদের জামায় লাগানো থাকতো কালো কাপড়ের ব্যাজ। কিন্তু এটা যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হয়ে গেল, তখন থেকেই এর রূপ পাল্টাতে শুরু করল। শোকের দিবসটি পরিণত হলো উৎসবের দিবসে। এই দিবস পালনে বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের যে আবেগ ছিল, সেই আবেগের দিবসটি সরে যেতে লাগলো ! একান্ত আমাদের আবেগের দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়ে যাওয়ার ফলে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আমাদেরকে অনেক উচ্ছ্বসিত কথাবার্তা শোনাতে পেরেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বাংলার প্রতি আমাদের টান কমিয়ে ফেললেন, দিবসটাকেও করে ফেললেন হালকা। এখন যারা এই দিবস পালনে যান, তারা কিছু ছবি উঠান, ফেসবুকে পোস্ট করেন, টেলিভিশনের চেহারা দেখান; এই পর্যন্তই।

সে যাক, প্রসঙ্গ ছেড়ে অনেক কথা বলে ফেললাম। প্রসঙ্গে থাকা প্রয়োজন। সেই প্রসঙ্গ ধরেই বলছি, আমার যতদূর মনে পড়ে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আমরা স্কুলটির শহীদ মিনারে পুস্পার্ঘ্য অর্পণ করেছি। রাত জেগে বিভিন্ন বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করতাম। শহীদ বেদীতে দেওয়ার জন্য মালা ও তোড়া বানাতাম। আমরা ছোট ক্লাসের ছাত্ররা সেটা খুব উৎসাহ নিয়ে করতাম। উপরের ক্লাসের ছাত্ররা আমাদের নির্দেশনা দিতেন। ভোরে খালিপায়ে প্রভাতফেরী করার সময় আমাদের হাতে হাতে থাকতো ফুল। প্রভাতফেরী শহীদ মিনারে নিয়ে এসে ফুলের তোড়া ও মালা শহীদ বেদীতে দিতাম। আমাদের হাতে থাকা ফুলগুলো খুব শ্রদ্ধা ভরে বেদীতে রাখতাম। আমার স্মৃতিতে যতটুকু আছে, সে থেকে বলছি; সেই পঁচাত্তর সাল পর্যন্ত ধূপ-ধুনার ধোঁয়া ঘোরানোর প্রচলনটা আমাদের স্কুলের শহীদ মিনারে ছিলো। পরবর্তীতে বুঝতে পারি একটি সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে পুজোর অনুসঙ্গ হিসেবে এই ধূপ-ধুনার ধোঁয়া ছড়াতেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার ঘটনার পর দেশের পট পরিবর্তন যখন ঘটলো, তারপর আর অনেকদিন একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরীতে শহীদ মিনারে যাইনি। এক সময় স্কুলের শহীদ মিনারটি বিলুপ্ত হয়ে গেল! ওখানে দেখলাম বাগান কিছুটা সম্প্রসারিত হয়েছে। পরবর্তী ক'বছরের মধ্যে স্কুল জীবনই শেষ হয়ে গেল।

আমার বাল্যকালের কিছু স্মৃতি এখানে বলার কারণ এই যে, গত একুশ ফেব্রুয়ারি; ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফুল দিলেন, তারপর মোনাজাত করলেন, সেই নতুনত্ব দেখেই পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল। আমার বাল্যের স্মৃতিতে ছিল শহীদ মিনারে ধূপ-ধুনার ধোঁয়া দেয়ার বিষয়। আর এই বয়সে এসে সংযোজিত হলো পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর শহীদদের মাগফেরাতে মোনাজাত করা।

যদিও মোনাজাতের বিষয়টি ঢাকায় ও এক দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখলাম সংযোজিত হয়েছে। মফস্বলে এখনো ছড়ায়নি! আগামীতে নিশ্চয়ই জেলা উপজেলায় বিশ্ববিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় ও গ্রামে গঞ্জের প্রতিটি বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়বে।

এই সুযোগে আমি একটি প্রস্তাব রাখছি। শহীদ মিনারের পাশাপাশি একুশে ফেব্রুয়ারিতে মসজিদ ও মাদ্রাসা-সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফেরাতের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দোয়ার আয়োজন করার জন্য। গীর্জা, মন্দির, প্যাগোডা কিংবা বিহারগুলোতেও প্রার্থনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে ভাষা শহীদদের আত্মদানের কারণেই আমরা আমাদের মায়ের ভাষা, প্রিয় বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে পেরেছিলাম। আমি বাংলা ভাষার শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।