মনিরুজ্জামান মনির


বাংলাদেশ রেলওয়ে নিয়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা এবং সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হলো—রেলকে বছরের পর বছর “লোকসানী প্রতিষ্ঠান” হিসেবে চিহ্নিত করা, তারপর সেই তকমাকেই রেলের ব্যর্থতার একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করানো। বাস্তবে রেল লোকসানী হওয়ার কথা নয়। রেল লোকসানী হয়েছে কারণ তাকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছে, ক্ষমতাহীন রাখা হয়েছে এবং সবচেয়ে ভয়াবহভাবে সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির হাতে বন্দী করে রাখা হয়েছে।

রেল কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। রেল হচ্ছে রাষ্ট্রের কৌশলগত অবকাঠামো, জাতীয় সংযোগের মেরুদণ্ড, বন্দর-শিল্প-ব্যবসা নির্ভর অর্থনীতির চালিকা শক্তি এবং নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের প্রধান মাধ্যম। অথচ বাংলাদেশে রেলকে এমনভাবে পরিচালনা করা হয়েছে যেন এটি রাষ্ট্রের বোঝা। সড়ককে অগ্রাধিকার দিয়ে রেলকে পিছনে ঠেলে দেওয়ার যে নীতি গত কয়েক দশকে দৃশ্যমান হয়েছে, তা কেবল ভুল নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিবহন পরিকল্পনার ব্যর্থতা। এর ফল এখন চোখের সামনে: জ্বালানি অপচয়, সড়ক অবকাঠামোর দ্রুত ক্ষয়, যানজট, দুর্ঘটনা, মাল পরিবহনে অস্বাভাবিক ব্যয় এবং বন্দরনির্ভর অর্থনীতিতে লজিস্টিক ব্যর্থতা। এসব ব্যর্থতার দায় কোনো একক মন্ত্রণালয় বা কোনো একক ব্যক্তির নয়—এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

এই বাস্তবতায় রাজধানীর রেল ভবনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি যে ঘোষণা দিয়েছেন “সরকার আর বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকসানী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায় না” এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রেলকে ঢেলে সাজিয়ে লাভজনক ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো—তিনি আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচলের সময় কমিয়ে আনার উপায় এক সপ্তাহের মধ্যে নির্ধারণের নির্দেশও দিয়েছেন।

কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে উঠে আসে—এবার কি সত্যিই রেল সংস্কার হবে, নাকি সিন্ডিকেটের কাছে আবারও পরাজয় হবে? কারণ আমরা অতীতেও দেখেছি: সভা হয়েছে, ঘোষণা এসেছে, পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে—কিন্তু বাস্তবে সিন্ডিকেট টিকে থেকেছে, কালোবাজারি বহাল থেকেছে, নিয়োগ-দুর্নীতি অব্যাহত থেকেছে, জমি দখল আরও বেড়েছে এবং রেল ধীরে ধীরে আরও দুর্বল হয়েছে। অতএব, এবার রেল সংস্কার যদি সত্যিই বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে এটিকে “প্রকল্প” হিসেবে নয়—রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর এই পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত হলো—রেলের ভেতরে ও বাইরে থাকা স্বার্থান্বেষী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।

রেলকে লোকসানী বলার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ঠকানো হয়েছেঃ বাংলাদেশে রেলকে লোকসানী বলা হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন রেলকে নীতিগতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, আগে রেলকে অবহেলা করা হলো, তারপর সেই অবহেলার ফলকে “লোকসান” বলে উপস্থাপন করা হলো। এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় প্রতারণা। রেল যখন যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করে, তখন সে শুধু ভাড়া আয় করে না; সে জাতীয় অর্থনীতিকে বহুমুখী লাভ দেয়। রেল সড়কের ওপর চাপ কমায়, জ্বালানি সাশ্রয় করে, দুর্ঘটনা কমায়, বন্দর-শিল্পাঞ্চলে পণ্য পরিবহন দ্রুত করে, পরিবেশ দূষণ কমায়, শ্রমবাজারের গতিশীলতা বাড়ায় এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমায়। অতএব রেলকে লোকসানী বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। রেলকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। আর সেই পুনর্গঠন না হলে, লোকসানের ক্ষতি শুধু রেলের নয়—ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের।

রেলের সংকট: সমস্যার উৎস পাঁচটি স্তরেঃ বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান সংকটকে পাঁচটি স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়—

১) ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও কাঠামোগত অকার্যকারিতাঃ বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালক প্রশাসনিকভাবে পূর্ণ ক্ষমতাবান নন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত মন্ত্রণালয় নির্ভরতা আছে। ফলে অপারেশনাল সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া যায় না। মাঠ পর্যায়ে সমস্যা জমে থাকে। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি নিজ প্রতিষ্ঠানের অপারেশনাল ক্ষমতা না পান, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা কোথায় দাঁড়াবে? রেলওয়ে আজ মূলত এই ক্ষমতাহীনতার ফল ভোগ করছে।

২) আর্থিক শৃঙ্খলার ভঙ্গুরতাঃ ভাড়া কাঠামো বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। টিকিট কালোবাজারি ও কাউন্টার ব্যবস্থার দুর্বলতা রাজস্ব নষ্ট করছে। মাল পরিবহনে কমিশন সিন্ডিকেট রেলের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে। রেলের আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ না হলে, রেলের লোকসান-লাভের প্রকৃত চিত্রও জনসমক্ষে আসে না। এতে গুজব, অপপ্রচার এবং সুবিধাবাদী বয়ান আরও শক্তিশালী হয়।

৩) সেবা সংকট ও সময়ানুবর্তিতাঃ ট্রেন বিলম্বকে আমরা স্বাভাবিক করে ফেলেছি। কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় পরিবহন ব্যবস্থায় বিলম্ব “স্বাভাবিক” হতে পারে না। সময়ানুবর্তিতা ছাড়া রেল আধুনিক হতে পারে না। স্টেশনের ব্যবস্থাপনা দুর্বল, কোচের পরিচ্ছন্নতা অনেক ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য, যাত্রী নিরাপত্তা ও তথ্য সেবা সীমিত। এসবের দায় কেবল মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নয়—এটি নীতিগত ব্যর্থতা।

৪) দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও কালোবাজারিঃ রেলের সবচেয়ে ভয়াবহ শত্রু হলো সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট টিকিট, মাল বুকিং, ঠিকাদারি, নিয়োগ, বদলি এবং রেল সম্পদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সিন্ডিকেট ভাঙা ছাড়া রেল সংস্কারের সব কথাই হবে ফাঁকা বুলি। কারণ সিন্ডিকেটের অস্তিত্বই রেলকে লোকসানী বানিয়ে রাখে।

৫) সম্পদ ও জমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতিঃ বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। অথচ এই সম্পদের বড় অংশ অবৈধ দখল, স্বার্থান্বেষী লিজ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং চুক্তিভিত্তিক অপব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত। রেল জমি যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যেত, তাহলে রেল আর্থিকভাবে অনেক আগেই শক্তিশালী হতে পারত। কিন্তু রেল জমি বহু ক্ষেত্রে রেলের সম্পদ না হয়ে দুর্নীতির উৎসে পরিণত হয়েছে।

সংস্কারের লক্ষ্য: রেলকে সেবামুখী ও রাজস্ব-সক্ষম করতে হবেঃ রেল সংস্কারের লক্ষ্য হবে-রেলকে লোকসানী নয়, রাজস্ব-সক্ষম প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর, টিকিট কালোবাজারি ও দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা, সময়ানুবর্তিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাল পরিবহনে রেলের বাজার অংশ বাড়ানো, রেল জমি ও সম্পদ উদ্ধার ও সঠিক ব্যবহার, ডিজিটাল, তথ্যভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, ধাপে ধাপে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।

১৮০ দিনের সংস্কার: ‘শক থেরাপি’ ছাড়া রেল বাঁচবে নাঃ মন্ত্রী ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ১৮০ দিন কি সত্যিই কার্যকর হবে, নাকি এটি আরেকটি ফাইল-ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় পরিণত হবে? বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে ১৮০ দিনে সংস্কার করতে হলে “শক থেরাপি” প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ, কিছু কাজ এমনভাবে করতে হবে—যাতে সুবিধাভোগীদের নড়েচড়ে বসতে হয়।

১) দুর্নীতি নির্মূলে যুদ্ধ ঘোষণাঃ দুর্নীতি নির্মুল করতে হলে দেশে রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দকে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি বন্ধ না হলে রেল সংস্কারের কোনো অর্থ নেই। রেলওয়ের অনবোর্ড সেবা, কেনাকাটা, টেন্ডার এই সমস্ত ঠিকাদারী কাজের সাথে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের অনৈতিক অবৈধ গোপন ব্যবসায়িক আঁতাত বন্ধ না হলে রেলের কোন উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

২) ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সময় কমানো: এক সপ্তাহ নয়, এক মাসে ফল চাইঃ ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট কেবল একটি রুট নয়—এটি দেশের অর্থনীতির স্নায়ু। সময় কমাতে হলে— টাইম টেবিল বাস্তবসম্মত করতে হবে, ইঞ্জিন ও কোচ রেডিনেস রিপোর্ট বাধ্যতামূলক, ট্র্যাক ও সিগন্যালিং বটলনেক দ্রুত সমাধান, বিলম্বের কারণ প্রকাশ, রুটে নির্দিষ্ট সংখ্যক ফাস্ট সার্ভিস ট্রেন।

৩) স্টেশন ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা ঃ স্টেশন হচ্ছে রেলের মুখ। স্টেশন যদি অগোছালো হয়, রেলের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে— টয়লেট, পানি, আলো, সিসিটিভি—অডিট, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, স্টেশন ম্যানেজারের কচও, যাত্রী সহায়তা ডেস্ক, ঈদযাত্রা: ব্যর্থ হলে সরকারকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। ঈদযাত্রা রেলের বড় পরীক্ষা। এখানে ব্যর্থ হলে জনগণের কাছে সরকারের সংস্কার দাবি বিশ্বাসযোগ্য হবে না। প্রয়োজন- অতিরিক্ত কোচ/স্পেশাল ট্রেন, অনলাইন বিক্রয় বৃদ্ধি, নারী, শিশু, বয়স্কদের আলাদা সহায়তা, মেডিকেল টিম ও শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি।

এক বছরের সংস্কার: প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও মানবসম্পদ পুনর্গঠনঃ ১৮০ দিনের পর এক বছরের মধ্যে যে কাজগুলো করতে হবে—

১) ডিজির ক্ষমতা বৃদ্ধি: না হলে সব সংস্কার ভেঙে পড়বেঃ রেল পরিচালনায় ডিজিকে অপারেশনাল স্বাধীনতা দিতে হবে। মন্ত্রণালয় নীতিনির্ধারণ করবে, রেলওয়ে বাস্তবায়ন করবে—এই কাঠামো না দাঁড়ালে কোনো সংস্কার টিকবে না। ২) নিয়োগ ও বদলি: দুর্নীতির মূল উৎস বন্ধ করতে হবে ঃ রেলে নিয়োগ ও বদলি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ বহু পুরোনো। তাই— নিয়োগে পূর্ণ স্বচ্ছতা, পদোন্নতিতে পারফরম্যান্স স্কোরিং, বদলিতে ডিজিটাল ট্রান্সফার পলিসি, দুর্নীতিতে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৩) মাল পরিবহন: রেলের লাভজনকতার একমাত্র বাস্তব পথঃ যাত্রী পরিবহন দিয়ে রেল কখনোই প্রকৃত অর্থে লাভজনক হতে পারে না। রেল লাভজনক হবে মাল পরিবহনে। তাই—বন্দরভিত্তিক কন্টেইনার ট্রেন, শিল্পাঞ্চলে মালবাহী রুট, ওয়াগন ও ইয়ার্ড সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাল বুকিং অনলাইন ও ট্র্যাকিং।

৩-৫ বছরের কৌশলগত সংস্কার: আধুনিক রাষ্ট্রীয় রেল নির্মাণ

১) করপোরেটাইজেশন: ধাপে ধাপে, তবে দৃঢ়ভাবেঃ বাংলাদেশ রেলওয়েকে ধাপে ধাপে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোতে নিতে হবে— বোর্ড অব ডিরেক্টরস, পৃথক অডিট, এসওপি ভিত্তিক ক্রয়, প্রকল্প, অপারেশন। ২) সিগন্যালিং ও নিরাপত্তা: দুর্ঘটনা বন্ধ না হলে রেল কখনো আধুনিক হবে না-আধুনিক সিগন্যালিং, লেভেল ক্রসিং অটোমেশন, রেল সেফটি অথরিটি, রেল পুলিশ আধুনিকায়ন। ৩) রেল-সড়ক-নৌ সমন্বিত লজিস্টিক নেটওয়ার্ক- বন্দরভিত্তিক মাল পরিবহনে রেলের অংশ ২-৩ গুণ বৃদ্ধি, আইসিডি ও লজিস্টিক হাব, স্থলবন্দর, নৌবন্দর, শিল্পাঞ্চলে রেল সংযোগ।

রেল জমি: রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর দখলদারিত্ব বন্ধ করতে হবেঃ রেল জমির অবৈধ দখল, চুক্তির অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব রেলের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করছে। তাই— ডিজিটাল ম্যাপিং, উচ্ছেদ অভিযান, লিজ নীতিমালা সংস্কার, স্বার্থবিরোধী চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন, জমি আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ রেলের উন্নয়নে ব্যয় নিশ্চিত।

কেপিআই ছাড়া সংস্কার হবে না: মাপা না গেলে বদলানো যায় না

রেল সংস্কার যদি সত্যিই বাস্তব হয়, তাহলে কিই পারফর্মেন্স ইন্ডিকেটরস (কেপিআই) প্রকাশ করতে হবে। যেমন-সময়ানুবর্তিতা (%), কালোবাজারি মামলার সংখ্যা, অভিযোগ নিষ্পত্তির গড় সময়, মাল পরিবহনে আয় বৃদ্ধি, দুর্ঘটনা হ্রাস, স্টেশন পরিচ্ছন্নতা স্কোর, জমি উদ্ধার পরিমাণ, রাজস্ব ফাঁস কমার হার। কেপিআই জনসমক্ষে প্রকাশ না করলে, সংস্কার আবারও ফাইলের মধ্যে আটকে যাবে—এটাই বাস্তবতা।

সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে

বাংলাদেশ রেলওয়ে আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আরেকটি ব্যর্থ পরিকল্পনা বা আরেকটি ফাইলবন্দি কর্মসূচি রাষ্ট্রের জন্য কেবল সময়ক্ষেপণ নয়—একটি ঐতিহাসিক অপরাধ হয়ে উঠবে। কারণ রেলকে দুর্বল রেখে কোনো দেশ টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে না; রেলকে সিন্ডিকেটের হাতে বন্দী রেখে কোনো সরকার জনস্বার্থ রক্ষা করতে পারে না; আর রেলকে “লোকসানী” তকমা দিয়ে দায় এড়াতে থাকলে একদিন রাষ্ট্রকেই তার মূল্য দিতে হবে।

এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—রেল সংস্কার হবে বাস্তবে, নাকি আবারও বক্তৃতা, সভা ও নির্দেশনার চক্রে পড়ে জনগণকে হতাশ করা হবে। রাষ্ট্র যদি সত্যিই রেলকে জাতীয় পরিবহনের মেরুদণ্ড বানাতে চায়, তাহলে এই মুহূর্তেই কঠোরতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে সংস্কার শুরু করতে হবে। কারণ রেল বাঁচানো মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান বাঁচানো নয়—রেল বাঁচানো মানে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং জনআস্থাকে বাঁচানো।

সংক্ষিপ্ত সুপারিশ

১) ১৮০ দিনের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা ২) টিকিট কালোবাজারিতে জিরো টলারেন্স ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা ৩) ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সময় কমানোর বাস্তব ফল এক মাসে দৃশ্যমান করা ৪) স্টেশন ব্যবস্থাপনা কেপিআই ভিত্তিক করা ৫) ডিজির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অপারেশনাল স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা ৬) মাল পরিবহনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া ৭) রেল জমি ডিজিটাল ম্যাপিং ও উদ্ধার অভিযান জোরদার করা ৮) রেল সেফটি অথরিটি গঠন করা ৯) যাত্রীসেবা—পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা ১০) কেপিআই ড্যাশবোর্ড নিয়মিত আপডেট ও জনসমক্ষে প্রকাশ

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।