'অন্য গ্রামে বসতি গড়েও প্রাণে বাঁচলেন না তারা'
রূপক মুখার্জি, নড়াইল : ‘দশ-বারো বছর আগে ওই খয়ের চেয়ারম্যানের অত্যাচারে ভিটেবাড়ি বেইচে আরেক গ্রামে আইসে বাড়ি বানাইছি, তাও আমার স্বামীরে বাচতি দেল না। এহন আমার এই ছোট ছোট দুইডা বাচ্চা নিয়ে কি করবো? ওর বাপ দাদা সব গেলো।’
শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে এভাবেই চিৎকার করে কাঁদছিলেন প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত তাহাজ্জুদ হোসেনের স্ত্রী সুমি বেগম।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নড়াইল সদর উপজেলার সিংগাশোলপুর ইউনিয়নের বড়কুলা গ্রামে প্রতিপক্ষের হামলা, পাল্টা হামলায় মোট চারজন নিহত হয়েছেন। নিহত তাহাজ্জুদ হোসেন তাদেরই একজন।
এ ঘটনায় তার পিতা খলিল শেখও নিহত হয়েছেন। নিহত অন্যরা হলেন, ফেরদৌস হোসেন এবং সাবেক চেয়ারম্যান খায়ের গ্রুপের ওসিবুর মিয়া (হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৮টার দিকে মারা যান)।
এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত দশ। তারা খুলনা, যশোর ও নড়াইল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
যদিও দুপুর পর্যন্ত পাঁচজন নিহতের খবর ছড়িয়েছিল। তবে সন্ধ্যায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চারজন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড়কুলা গ্রামের মাঝখান দিয়ে পাকা রাস্তা, দুপাশে সারি সারি সবুজ ধান ক্ষেত। ফাঁকা ফাঁকা কিছু বাড়িঘর। এদিকটায় জনবসতি কম। পুলিশ, সেনাবাহিনী, উৎসুক জনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সদস্যরা ঘিরে আছে পুরো এলাকা।
খলিল শেখের বাড়ির সামনে আসতেই দেখা গেলো রাস্তার ওপর পড়ে রয়েছে তার লাশ।
কিছুদূর পরই একইভাবে পড়ে আছে ফেরদৌস হোসেনের লাশ। বাড়ি ভিতর উঠানে পড়ে রয়েছে তাহাজ্জুদ হোসেনের লাশ। স্বজন ও এলাকাবাসীর আর্তনাদ ও কান্নায় ভারি হয়ে আছে আশপাশ।
তাহাজ্জুদ হোসেনের বোন, ফুফুসহ স্বজনদের একটাই দাবি, খুনি খয়ের চেয়ারম্যান ও তার সাথীদের ফাঁসি চাই।
তারা জানান, প্রায় চার কিলোমিটার দূরে তারাপুর গ্রাম থেকে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বড়কুলা গ্রামে এসে খয়ের চেয়ারম্যানের লোকেরা এসে ঘর থেকে বের করে তিনজন মানুষকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে চলে যায়। কীভাবে কি হয়ে গেলো কিছুই বুঝতে পারছেন না স্বজনরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এদের এক পক্ষের নেতা সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা ওরফে খয়ের এবং আরেক পক্ষে আছেন আরেক সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল শেখ (যার বাড়ি ইউনিয়নের অন্য প্রান্তে গোবরা গ্রামে)। যদিও বর্তমানে শেখ বংশের হাল ধরেছিলেন তারাপুর গ্রামের খলিল শেখ।
এলাকবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, গত বিশ বছরে এই দুই পক্ষের মধ্যে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ বার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ইতিপূর্বে একাধিক হত্যার ঘটনাও রয়েছে।
নিহত খলিল শেখের পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী জানান, খয়ের চেয়ারম্যানের অত্যাচারে টিকতে না পেরে প্রায় ১০/১২ বছর আগে তারাপুর গ্রাম থেকে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একই ইউনিয়নের বড়কুলা গ্রামে ফাঁকা বিলের পাশে বসতি গড়েন খলিল শেখের পরিবারসহ চারটি পরিবার। দূরে থাকলেও উভয় পক্ষের মধ্যে রেষারেষি, মামলা-হামলা চলমান ছিল।
মাস খানেক আগে একটা মামলার হাজিরা দিতে নড়াইল কোর্টে যাওয়ার পথে ওই ইউনিয়নের চুনখোলা মোড়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। যেখানে আটজন্য আহত হন।
স্থানীয়রা জানান, সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা এবং সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল শেখ বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও তাদের কোন পদ নেই। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি একবার একই মঞ্চে বসিয়ে দুজনের বিবাদ মিটিয়ে দিয়েছিলেন।
সে সময় তারা ওই এমপির ছত্রছায়ায় থাকতেন। তবে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে এবার তারা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। বর্তমানে উজ্জ্বল চেয়ারম্যান একটি মালায় জেলে আছেন।
সংঘর্ষের ঘটনা শুনে সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বেলা ১১টার দিকে নিহত খলিল শেখের বাড়িতে আসেন। তিনি নিহতের পরিবারের সাথে কথা বলেন। উপস্থিত পুলিশ সুপার, সেনাবাহিনী, র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন।
পরে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় অবশ্যই আনা হবে। পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার সাথে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করবে বলে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই। কোন অপরাধীই ছাড়া পাবে না’।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানায় হয়েছে, লাশের সুরতহাল শেষে ময়না তদন্তের জন্য নড়াইল সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে।
এদিকে, সিংগাশোলপুর ইউনিয়নে সংঘর্ষে চারজন নিহতের ঘটনায় রনি সিকদার নামে একজনকে আটক করেছেন র্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের সদস্যরা। তিনি সিংগাশোলপুর বড়কুলা গ্রামের আমিন সিকদারের ছেলে।
র্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর এটিএম ফজলে রাব্বি প্রিন্স আটকের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেছেন, নড়াইল সদর উপজেলার সিংগাশোলপুর ইউনিয়নে সংঘর্ষ বাঁধানোর জন্য বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে রনি একজন।
ওই সংঘর্ষ সৃস্টির জন্য রনির উস্কানিমূলক তৎপরতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া আরো ৪/৫ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের ক্যাম্পে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে আটক রনি মূল অভিযুক্ত বলে তিনি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নড়াইলের পুলিশ সুপার আল মামুন শিকদার বলেছেন, এলাকায় নতুন করে সহিংসতা এড়াতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে গ্রামজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
(আরএম/এএস/ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬)
