রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সরকারি কম্বল বিতরণকে কেন্দ্র করে ইউপি চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের দুই সদস্যকে মারপিট করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সরসকাটি বাজারে জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারী মনিরুল ইসলাম ও তার লোকজনের ভয়ে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ও থানায় অভিযোগ দিতে পারেননি।

জয়নগর ইউপি চেয়ারম্যান বিশাখা তপন সাহা জানান, ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অটো রিক্সা প্রতীক নিয়ে জয়নগর ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। ২৭ নভেম্বর থেকে পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে গত ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি কলারোয়া উপজেলা পরিষদে গেলে ভালভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিষয়টি ইউপি সচীবকে জানানো হলেও তিনি যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় তিনি এসে পতাকা উত্তোলনসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরিফ হোসেন তাকে ফোন করে বরাদ্দকৃত কম্বল নিয়ে যেতে বলেন।

২২ ফেব্রুয়ারি ৪৮ পিস কম্বল নিয়ে আসা হয়। তিনজন সংরক্ষিত নারী সদস্যকে নয়টি, নয়জন ইউপি সদস্যকে (পুরুষ) ১৮টি, নয়জন গ্রাম পুলিশকে নয়টি, নয়জন, চেয়ারম্যানের জন্য নয়টি ছাড়াও আনসার কমা-ার মেহেদীকে একটি, সচিবকে একটি ও উদ্যোক্তা মিঠুন সাহাকে একটি কম্বল বরাদ্দ করা হয়। কম্বলগুলো পরিষদে এসে তিনি নিজ হাতে বিতরণ করতে চাইলে সচীব হামলার ভয় দেখালে তিনি তার নিজের নয়টি কম্বল ও গ্রাম পুলিশের বরাদ্দকৃত নয়টি কম্বলসহ গ্রাম পুলিশদের ইউনিফর্ম পরে তার বাড়িতে নিজ হাতে বিতরণ ও ছবি তোলার জন্য সচীবকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিষয়টি সচিব হাবিবুর রহমান বিভিন্ন স্থানে জানিয়ে দিলে পরিষদের সামনে থেকে একটি ইজিবাইকে কম্বল নিয়ে একজন ইউপি সদস্য ও কয়েকজন গ্রামপুলিশ তার বাড়িতে আসতে চাইলে ইউনিয়ন জামায়াতের সদস্য সচিব মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে জামায়াতের কিছু লোকজন ওই কম্বল গাড়ি থেকে নামিয়ে রেখে পরিষদের এসে তাকে (চেয়ারম্যান) কম্বল বিতরণ করতে বলা হয়।

পরিষদের সামনে হৈ চৈ চলার সময় বিকেল পৌনে ৫ টার দিকে তার ভাসুরের ছেলে সাগর ওরফে মোহনলাল সরসকাটি বাজারে মটর সাইকেল মেরামত করতে এসে পরিষদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় কয়েকজন তার (বিশাখা) অবস্থান জানার চেষ্টা করে। এ সময় তিনি ও তার ভাসুরের ছেলে রামপদ সাহা মটর সাইকেলে পরিষদের সামনে হাজির হন। জামায়াত সেক্রেটারী মনিরুল তার কাছে পরিষদে আসার কারণ জানতে চায়। কম্বল বিতরণ করতে এসেছেন উত্তর দিলে মনিরুল বলেন, ২০১৩ সালে জামায়াতের চেয়ারম্যান মাওলানা কামরুজ্জামানকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি। তাই আপনাকেও দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হবে না। ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া হবে।

সাবেক ইউপি সদস্য বজলুর রহমান বলেন, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর উত্তম মজুমদারকে কেন প্রকল্প দেওয়া হয়নি? ইউপি সদস্য উত্তম মজুমদার দুটি কম্বল নিয়ে যাওয়ার পরও উল্টো পাল্টা কথা বললে সাগর প্রতিবাদ করলে তাকে মারপিট করে সাবেক ইউপি সদস্য বজলুর রহমান, ইউপি সদস্য উত্তম মজুমদার. ২ নম্বর জামায়াতের সভাপতি মুকুল হোসেন, জামায়াত কর্মী দক্ষিণ ক্ষেত্রপাড়ার জামায়াত সম্পাাদক পলাশ হোসেন খোর্দ্দ-বাটরা গ্রামের মাসুদ, রায়হান শেখ, মামুন, দক্ষিণ ক্ষেত্রপাড়ার বাবলু, উত্তর ক্ষেত্রপাড়ার রুহিন আহম্মেদ পলাশসহ কয়েকজন। এ সময় ভাই সাগরকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে রামকেও এলোপাতাড়ি কিল, চড় ও ঘুষি মারা ছাড়াও লাথি মারা হয়। রাম ও সাগরের মোবাইল নিয়ে নেয় মাসুদ ও মুকুল।

পরিষদের সামনে তাকে কম্বল চোর হিসেবে আখ্যা দেয় মনিরুল ইসলাম। তবে রাম ও সাগরের মোবাইল ফোন পরে ফেরৎ দেওয়া হয়। জামায়াত নেতা মনিরুল ইসলাম তার বুকে একটি ঘুষি মারেন বলে অভিযোগ করেন বিশাখা তপন সাহা। এ সময় সচীবসহ গ্রামপুলিশরা পরিষদের বারান্দায় দাঁড়ি থাকলেও তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসেননি। খবর পেয়েও আসেনি ঢিঁল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থান করা ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা। এক পর্যায়ে কয়েকজনের সহযোগিতায় তিনি, রাম ও সাগর বাড়ি ফেরার সময় এক জামায়াত নেতা জাহাঙ্গীর মাওলাানার এতিমখানায় ঢুকে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেবুন্নাহার, থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচএম শাহীনসহ ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর সিরাজুল ইসলামসহ জামায়াতের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন। এরপর তারা বাড়িতে অবস্থান নিলেও হামলাকারিদের ভয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ও থানায় অভিযোগ দিতে যেতে পারেননি।

প্রত্যক্ষদর্শী জয়নগরের আব্দুল হান্নান, গ্রাম পুলিশ বিমল সরকার ও বিশ্বজিৎ সরকার পরিষদের সামনে চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের দুই সদস্যকে মারপিটের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এ ব্যাপারে জয়নগর ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারী মনিরুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বুধবার বিকেলে পরিষদের সামনে একটি ইজি বাইকে করে কম্বল চেয়ারম্যানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় জনগন আটক করে। এ সময় খবর পেয়ে তিনি সেখানে আসেন। সেখানে কোন মারপিটের ঘটনা ঘটেনি।

জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদের সচীব জিএম হাবিবুর রহমান বলেন, চেয়ারম্যানের বাড়িতে নয়জন গ্রাম পুলিশ, তাদের ও চেয়ারম্যানের ১৮টি কম্বল একটি ইজি বাইকে তোলার সময় ঠেলাঠেলি ও মারপিটের ঘটনা ঘটেছে। তরে মারপিটের সময় বজলুর রহমানকে দেখলেও অন্য কাউকে দেখেননি। তারা চেয়ারম্যানের বাড়িতে কম্বল নিয়ে যেতে বাধা দেয়। তবে কম্বল চুরির অভিযোগ ঠিক নয়।

সরসকাটি পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক তরিকুল ইসলাম জানান, তিনি ওই দিন সাতক্ষীরায় পুলিশ কল্যাণ পরিষদের সভায় ছিলেন। সন্ধ্যার পর ঘটনা জেনেছেন।

কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচএম শাহীন বলেন, তিনি স্টেশনে না থাকায় একটি অভিযোগ ইউপি চেয়ারম্যান বিশাখা তপন সাহাকে সেকে- অফিসারের কাছে দিতে বলেছিলেন। তবে বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

(আরকে/এসপি/ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬)