জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশের সমর্থন
স্টাফ রিপোর্টার : ফিলিস্তিন ইস্যুতে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) নির্বাহী বৈঠকের সাইডলাইনে জেদ্দায় ব্যস্ত কূটনৈতিক তৎপরতায় সময় পার করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ একাধিক দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে প্রার্থিতায় সমর্থন চান। পাশাপাশি ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের দৃঢ় ও ধারাবাহিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে জেদ্দায় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের নেতাদের সঙ্গে এসব দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব বৈঠকে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার, সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এ এলখরেইজি, তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুলাকলিকায়া, ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভারসেন ওহানেস ভার্তান আগাবেকিয়ান এবং গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নির্বাহী বৈঠকের চেয়ারম্যান সেরিং মদু এনজির সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী নেতারা বাংলাদেশে নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তারা আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের পাশাপাশি উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত করবে।
নেতারা ফিলিস্তিনের পক্ষে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অবস্থানের প্রশংসা করেন এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বৈঠকে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পূর্ববর্তী সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে শিগগির বাংলাদেশ সফরের প্রত্যাশা করছেন। নতুন সরকারের অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুলাকলিকায়া বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে তুরস্কের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়। পাশাপাশি রমজানের পর বাংলাদেশ সফরের জন্য তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এ এলখরেইজি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সুবিধাজনক সময়ে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও রিয়াদ সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন খাতে নতুন সহযোগিতা ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন এবং এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়। এছাড়া ওআইসি সচিবালয়ের কার্যকারিতা বাড়াতে সংস্কার উদ্যোগে বাংলাদেশের সমর্থন কামনা করে সৌদি আরব।
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান বলেন, ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্ত অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই চলমান সংকটের একমাত্র সমাধান। ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের দৃঢ় ও ধারাবাহিক সমর্থনের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি ইউএনজিএ সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার পক্ষে আরব ও ইসলামি বিশ্বের সমর্থনের আশ্বাস দেন।
গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরিং মদু এনজির সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় গাম্বিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে গাম্বিয়ার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। আগামী এপ্রিলে বাগদাদে অনুষ্ঠিতব্য ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়।
গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের ইউএনজিএ সভাপতি পদে প্রার্থিতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। এ বিষয়ে আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সমর্থন আদায়ে কাজ করার আশ্বাস দেন।
এসব বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব রাষ্ট্রদূত মোল্লা ফারহাদ হোসেন এবং ওআইসিতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এম জে এইচ জাবেদ উপস্থিত ছিলেন।
ওআইসির এক বিশেষ বৈঠকে অংশ নিতে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা ছাড়েন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম বিদেশ সফর। সফরসঙ্গী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবিরও তার সঙ্গে রয়েছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি পদে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে ফিলিস্তিন। ফলে আগামী জুনে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন।
প্রায় চার দশক পর আবারও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ প্রায় চার বছর আগেই এই পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দেয়। ২০২৬-২৭ মেয়াদের জন্য এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নির্ধারিত এই পদে শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল ফিলিস্তিন। তবে সম্প্রতি তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত হয়ে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে দাঁড়িয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশ নির্বাচনে থাকবে কি না- এ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক বাংলাদেশকে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ানোর জন্য একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছিল বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
(ওএস/এএস/ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬)
