দুই মাস পর সুন্দরবনে কাঁকড়া আহরণ শুরু
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম ঘিরে দীর্ঘ দুই মাস বন্ধ থাকার পর পহেলা মার্চ রবিবার থেকে জেলেরা আবারে কাঁকড়া আহরণ করতে সুন্দরবনে যাত্রা শুরু করেছে। এতে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন সুন্দরবন উপকূলীয়ীয় এলাকার জেলে পরিবারের সদস্যরা।
সুন্দরবনের শ্যামনগর উপকুলীয় অঞ্চলের হরিনগর গ্রামের বিকাশ গাইন ও তাপস গাইন জানান, প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি দুই মাস কাঁকড়া ধরার পাস বন্ধ রাখা হয়। এ সময় অনেক জেলে পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। কেউ বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন, কেউ ধার দেনা করে সংসার চালিয়েছেন। নতুন মৌসুম শুরু হওয়ায় এখন তাদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
রোববার (১ মার্চ) সকাল থেকে বন বিভাগের পাশ (অনুমতিপত্র) নিয়ে কাঁকড়া আহরণের লক্ষ্যে সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন তাঁরা। এ উপলক্ষে জেলেরা নৌকা ও জাল মেরামতসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গোছানোর কাজ শেষ করেন শনিবারেই।
রবিবার সকালে সুন্দরবন সংলগ্ন হরিনগর জেলেপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পাশের চুনকুড়ি নদীর পাড় থেকে কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম নৌকায় তুলছেন জেলেরা। নৌকার সামনের অংশে প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই রেখে তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুন্দরবন যাত্রার। কেউ শেষ মুহূর্তের নৌকার ছোটখাটো ত্রুটি সারছেন। আবার কেউ কাঁকড়া ধরার দোন-দড়ি মেরামতের ব্যস্ত।
এ সময় কথা হয় জেলে পাড়ার কাঁকড়া ধরা জেলে অরুন মন্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেই তাঁর পাঁচ সদস্যের সংসার চলে। অন্য পেশার কাজে তিনি অভ্যস্ত নন। তাছাড়া এলাকায় অন্য কোনো কাজও নেই। বিগত দুই মাস কাঁকড়া ধরা বন্ধ থাকায় বাড়িতে অলস সময় কাটাতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত দুই মাস সংসার চালাতে মহাজনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। এখন নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে কাঁকড়া ধরে ঋণ পরিশোধের আশা তাঁর।
একই এলাকার কাঁকড়া ধরার জেলে নিত্যরঞ্জন মন্ডল নিজেকে হতদরিদ্র দাবি করে বলেন, দুই মাস নিষেধাজ্ঞা চলাকালে আমরা মতো দরিদ্র জেলেদের চরম দুর্দিন গেছে। বন্ধের দিনগুলোয় সরকারি কোনো ভাতার ব্যবস্থা না থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল কেউই সুন্দরবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁকড়া ধরতে যান না। যাঁরা যান, তাঁরা প্রায় সবাই দরিদ্র। রবিবার সকালে কাঁকড়া ধরার অনুমতি মিলেছে। দুই মাস পর আবারও সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে যেতে পারায় ভালো লাগছ।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী ও কোবাদক ফরেস্ট স্টেশনের আওতায় দুই হাজার ৯০০ টি নৌকার সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতিপত্র আছে। এর মধ্যে কাঁকড়া ধরার নৌকা এক হাজার ৬০০ টি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশনের আওতাধীন পুষ্পকাটি, মান্দারবাড়িয়া, নটাবেঁকি ও হলদেবুনিয়া এলাকা অভয়ারণ্য। এছাড়া দোবেকী ও কাঁচিকাটার ৫২ শতাংশ অভয়ারণ্য ঘোষিত। এছাড়াও সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবনের মধ্যে অভয়ারণ্য ঘোষিত ছোট কেয়াখালী খাল, বড় কেয়াখালী খাল, খোলশিবুনিয়া খাল ও সাপখালী খাল এবং ২৫ ফুটের কম প্রশস্ত খালে সারা বছরই কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ থাকে। বাকি অংশের নদী ও খালে বৈধ পাস-পারমিটধারী প্রায় ১৫ হাজার জেলে শুধু কাঁকড়া আহরণ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। ১৯৯৮ সালে কাঁকড়া রপ্তানির নীতিমালা প্রণয়নের পর থেকেই প্রতিবছর দুই মাস কাঁকড়া ধরার পাস বা অনুমতি বন্ধ রাখা হয়।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোঃ মসিউর রহমান জানান, কাঁকড়া বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুন্দরবনে বিভিন্ন নদী-খালে দুই মাস জেলেদের কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ ছিল। রবিবার থেকে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে জেলেরা প্রবেশ নিষিদ্ধ অভয়াশ্রম ছাড়া অন্য নদী-খালে কাঁকড়া আহরণ করতে পারবেন। তবে কেউ যাতে সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরার অনুমতি নিয়ে বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে না পারে, সে জন্য বনরক্ষীদের টহল ও অন্যান্য কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে কাঁকড়া পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
(আরকে/এএস/মার্চ ০১, ২০২৬)
