ঝিনাইদহে অভিযানেও থামছে না মাদকের কারবার
হাবিবুর রহমান রুবেল, ঝিনাইদহ : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা ঝিনাইদহে মাদক কারবারিরা দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও থামছে না ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও মাদকদ্রব্যের অবাধ বেচাকেনা। বিশেষ করে শহর ও গ্রামীণ এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট ছোট মাদক বিক্রির স্পট, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জেলার কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বাজার এলাকায় সক্রিয় রয়েছে মাদক কারবারিদের একটি শক্তিশালী চক্র। ভারতীয় সীমান্তর্বর্তী উপজেলা মহেশপুরের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে মাদক প্রবেশ করে প্রথমে গ্রামাঞ্চলে মজুদ করা হয়, পরে তা খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় শহর ও আশপাশের এলাকায়। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব কারবার পরিচালিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হঠাৎ করেই জেলা শহর ছাড়াও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম চরমভাবে বেড়ে গেছে। এর মধ্যে জেলা শহরের কালিকাপুর, চাকলাপাড়া, হামদহ, আরাপপুর, পবহাটি, সদর উপজেলার সাধুহাটি, হাটগোপালপুর, খাজুরা। কালীগঞ্জের কাশিপুর, চাচড়া, শিবনগর, আড়পাড়া, ঢাকালে পাড়া, বলিদাপাড়া, সিংঙ্গী, ফয়লা, হেলাই মাস্টারপাড়া, পাইকপাড়া, চাপালী, আনন্দবাগ, খয়েরতলা। শৈলকুপার কবিরপুর, শেখপাড়া, ফুলহরি, কাচেরকোল, ভাটইবাজারসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে দুপুর থেকে থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলছে মাদক বেচাকেনা। এসব মাদক মহেশপুর সীমান্ত থেকে সড়কপথে বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঝিনাইদহ জেলায় ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলের সরবরাহ বেড়েছে কয়েক গুণ। আগে যেসব এলাকায় মাদক লেনদেন তুলনামূলক কম ছিল, সেখানেও এখন প্রকাশ্যেই চলছে কেনাবেচা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকার নির্দিষ্ট কিছু চায়ের দোকান, পরিত্যক্ত ভবন, খেলার মাঠ ও গ্রামের নদীর চরে মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে। এসব জায়গাতে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে খোলামেলা পরিবেশে, অনেকে এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পায়। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাদক কারবারিরা যোগসাজশ করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এ ধরণের কর্মকা- পরিচালনা করে আসছে। স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে নামমাত্র অভিযান চালিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের আটক করলেও বড় বড় কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরের থেকে যায়। এমনকি তাঁরা মোটা অংকের টাকার বিনমিয়ে থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে।
জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন , ‘আগে গোপনে মাদক বিক্রি হতো, এখন প্রকাশ্যেই চলে। সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট দোকান ও বাড়িতে এখন মাদকের আসর বসছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ সহজে মাদক পেয়ে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কেবল অভিযান পরিচালনা করে নয় সামাজিক প্রতিরোধ, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার না করলে ঝিনাইদহে মাদকের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদরে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ মো. হাশেম আলী বলেন, ‘আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবলম্বন করছি। সম্প্রতি মাদকের বেশ কয়েকটি বড় চালান জব্দ করা হয়েছে। এছাড়াও বেশ কয়েকজন কারবারিকে আটক করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে। চিহ্নিত স্পটগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’
(এইচআর/এএস/মার্চ ০৪, ২০২৬)
