অপহৃত আলমের পরিবারের সংবাদ সম্মেলন
স্বাধীন মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, যশোর : যশোর প্রেসক্লাব হলরুমের গুমোট পরিবেশে তখন পিনপতন নীরবতা। টেবিলে বসে কাঁদছেন এক অসহায় নারী। পাশে বসে তার ১৬, ১০ ও ৪ বছরের তিন কন্যা। সবার ছোট চার বছরের শিশু আন আসকা আলম হৃদা। যে বয়সে বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে সে আজ সংবাদ সম্মেলনে।
টেবিলের ওপর ছোট্ট দুটি হাত রেখে, তার ওপর মাথা গুঁজে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে আছে ক্যামেরার লেন্সের দিকে। চঞ্চল এই শিশুটি গত তিনদিন ধরে তার বাবাকে দেখছে না। সময় অসময়ে বাবাকে বাবা বলে ডেকে খাবারের জন্য বাহানা ধরতে পারছে না। সে হয়তো বুঝতেও পারছে না, এক কোটি টাকা নামের এক পাহাড়সম অংকের জন্য তার বাবাকে আটকে রেখেছে নিষ্ঠুর অপহরণকারীরা। ছোট্ট হৃদার সেই স্তব্ধ চাহনি উপস্থিত সাংবাদিকদেরও আবেগাপ্লুত করে তোলে। বাবা হারানো আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছাপ ছিল পরিবারের প্রতিটি সদস্যের চোখে-মুখে।
গত সোমবার (২ মার্চ) রাতে অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সন্ধান ও অপহরণকারীদের বিচারের দাবিতে বুধবার দুপুরে প্রেসক্লাব যশোরে এই সংবাদ সম্মেলন করেন তার স্ত্রী মোসাম্মৎ রেশমা খাতুন। সেই সংবাদ সম্মেলনে এমনদৃশ্য উঠে আসে।
জাহাঙ্গীর আলম যশোর সদর উপজেলার ধর্মতলা এলাকার বাসিন্দা এবং ‘আর আর মেডিকেল ও জে আর এগ্রোভেট’-এর স্বত্বাধিকারী। রেশমা খাতুন লিখিত বক্তব্যে জানান, গত সোমবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন জাহাঙ্গীর। বাষ্পত্তি এলাকায় পৌঁছালে ওত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত তাকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় তার মোটরসাইকেলটিও।
ঘটনার মাত্র ১৫ মিনিট পরেই জাহাঙ্গীরের ফোন থেকে পরিবারের কাছে কল আসে। দাবি করা হয় ১ কোটি টাকা মুক্তিপণ। টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
কান্নায় ভেঙে পড়ে রেশমা খাতুন বলেন,আমার স্বামী একজন সৎ ও পরিশ্রমী ব্যবসায়ী। তার সাথে কারও কোনো শত্রুতা নেই। এক কোটি টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের পরিবারের নেই। আমার তিন মেয়ের বাবাকে আমি জীবিত ফেরত চাই।
ঘটনায় যশোর কোতয়ালী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই অপহরণকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব। সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসনের প্রতি তিনটি জোরালো দাবি জানানো হয়। যার মধ্যে রয়েছে, জাহাঙ্গীর আলমকে দ্রুত জীবিত উদ্ধার করা। অপহরণকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, জাহাঙ্গীরের বৃদ্ধা মা জাহানারা খাতুন, তিন মেয়ে রাফি, রুপু ও হৃদা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছেন এবং অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ জাহাঙ্গীরের পরিবারের উৎকণ্ঠা ততই বাড়ছে। এখন কেবল প্রশাসনের তৎপরতাই পারে হৃদার বাবার ছায়া তার মাথায় ফিরিয়ে দিতে।
(এসএমএ/এএস/মার্চ ০৪, ২০২৬)
