চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যা মামলার আসামি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক
তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান লেবু, কমলেশ বেদজ্ঞ, বিষ্ণুপদ কর্মকার ও রামপ্রসাদ চক্রবর্তী মানিক হত্যা মামলার আসামি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম দাড়িয়া হয়েছেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নবগঠিত কমিটির আহ্বায়ক। আবুল কালাম দাড়িয়াকে আহ্বায়ক করায় উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে এই কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে উল্লেখিত ৪ মুক্তিযোদ্ধা হত্যা মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম দাড়িয়াকে এ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। আবুল কালাম দাড়িয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান লেবু, কমলেশ বেদজ্ঞ, বিষ্ণুপদ কর্মকার ও রামপ্রসাদ চক্রবর্তী মানিককে হত্যা মামলার ৩ নম্বর আসামি।
এ মামলার অপর আসামীরা হলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিন (বীর বিক্রম), ফারুকুজ্জামান সরদার, মীর দেলোয়ার হোসেন, আবুল হাসেম দাড়িয়া, মোহন সরদার, মিলন সরদার, মোজাম সরদার, কুটিমিয়া সরদার, সামচুল হক মিয়া, নজির আহমেদ, ফজর আলী, আবুল হোসেন, নোয়াবালী মিয়া, জিল্লুর মোল্লা, ফুরু মিয়া, ফরমান আলী, মোতালেব মোল্লা, আবু বক্কর.মুজিবুর রহমান,মকবুল দাড়িয়া, লিয়াকত হোসেন ও ইয়াকুব আলী (ইকুব)।
১৯৭৩ সালের ১১ মার্চ দায়েরকৃত এই হত্যা মামলার ২ নম্বর আসামী ফারুকুজ্জামান সরদার, ৩ নম্বর আসামী আবুল কালাম দাড়িয়া ও ৭ নম্বর আসামী মিলন সরদার জীবিত রয়েছেন। এই মামলাটির বাদী হয়েছিলেন কমলেশ বেদজ্ঞের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা লুৎফর রহমান গঞ্জর। তবে মামলাটি বর্তমানে বাদী পরির্বতন হয়ে দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। বর্তমানে বাদী হয়ে বিচার প্রাথী হিসেবে মামলাটি লড়ে যাচ্ছেন কমলেশ বেদজ্ঞের মেয়ে সুতপা বেদজ্ঞ সন্ধ্যা।
এ মামলার বাদী সুতপা বেদজ্ঞ সন্ধ্যা বলেন, আমার পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। প্রথম সংসদ নির্বাচনে তিনি ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে কোটালীপাড়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচন শেষে ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ কোটালীপাড়া থেকে নৌকা যোগে গোপালগঞ্জ শহরে ফেরার পথে টুপরিয়া নামক স্থানে পৌঁছালে হেমায়েত উদ্দিনের নের্তৃত্বে আসামীরা আমার পিতা কমলেশ বেদজ্ঞসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান লেবু, বিষ্ণুপদ কর্মকার ও রামপ্রসাদ চক্রবর্তী মানিককে নির্মম ভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় ১১ মার্চ কোটালীপাড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ ৫৩ বছরেও আমরা এ নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার পাইনি। ইতোমধ্যে মামলাটির ২৩ জন আসামির মধ্যে ২০জন আসামি মারা গেছেন। বাকী ৩ জন আসামি জীবত রয়েছেন। হয়তো বা এ মামলার রায় হতে হতে বাকী ৩ জন আসামিও মারা যাবেন। তার পরেও আমি আমার পিতার হত্যা মামলার রায় দেখে যেতে চাই।
তিনি আরও বলেন, আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে এই ভেবে লজ্জাবোধ করছি যে,একজন খুনিকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। আমি দ্রুত এ কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান শেখ বলেন, আমাদেরকে না জানিয়ে রাতের আধারে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা দ্রুত এ কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি করছি।
এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম দাড়িয়ার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, রাতের আধারে কমিটি গঠনের কথাটি সত্য নয়। কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সব সদস্যের মতামতের ভিত্তিত্বে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আবুল কালাম দাড়িয়া বলেন, ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ ৪ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার ঘটনার সাথে আমি জড়িত ছিলাম না। আমাকে শত্রুতাবসত আসামী করা হয়েছিল। এই মামলার প্রকৃত আসামীরা কেউই জীবত নেই।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক ফিরোজ খান বলেন, কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বেশ কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতিতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।কমিটির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম দাড়িয়া যে, হত্যা মামলার আসামী এটা আমার জানাছিল না। এখন আমরা জেলা আহ্বায়ক কমিটির দায়িত্বরত মুক্তিযোদ্ধারা আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।
(টিবি/এসপি/মার্চ ০৬, ২০২৬)
