৫০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন
আশাশুনির সাবেক ভূমি কমিশনারসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠিয়ে অন্য নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, গর্ভস্ত সন্তান নষ্ট করতে বাধ্য করা ও ৫০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতনের ঘটনায় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) বিজয় কুমার জোয়ার্দারসহ তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মাগুরা জেলা সদরের মালন্দ অঙ্কুরপাড়ার গোপাল সরকারের মেয়ে ও বিজয় কুমার জোয়ার্দারের স্ত্রী মুক্তি সরকার বাদি হয়ে বুধবার রাতে আশাশুনি থানায় এ মামলা দায়ের করেন। বিজয় কুমার জোয়ার্দারকে আশাশুনি থেকে প্রত্যাহার করে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন- মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার ছোনগাছা গ্রামের পরিমল জোয়ার্দারের ছেলে বিজন কুমার জোয়ার্দার (৩৭), তার বাবা পরিমল কুমার জোয়ার্দার(৭০), মা ঊষা রানী জোয়ার্দার (৬২), ভাই পরিতোষ জোয়ার্দার (৩৩) ও পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ফাগুনী সুমি কাসারী (২৯)।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে প্রথম এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে পারিবারিকভাবে হিন্দু রীতিনীতি অনুযায়ী মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার ছোনগাছা গ্রামের বিজয় কুমার জোয়ার্দারের সঙ্গে মাগুরা জেলা সদরের মালন্দা গ্রামের অঙ্কুরপাড়ার গোপাল সরকারের মেয়ে মুক্তি সরকারের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় উপঢৌকন হিসেবে ছয় লাখ টাকার জিনিসপত্র দেন গোপাল সরকার। ২০১৮ সালে ঢাকার চাংখারপুলে আরাফাত জেনারেল হাসপাতাল ডায়াগোনোস্টিক স্টেন্টারে তার জোরপূর্বক গর্ভপাত করান বিজন জোয়ার্দার। এরপরও তাকে কয়েকবার গর্ভপাত ঘটানোর একপর্যায়ে তার শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। একের পর এক গর্ভস্ত সন্তান নষ্ট করানোর একপর্যায়ে সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলে তাকে স্বামী চেন্নাইতে পাঠিয়ে দেন চিকিৎসার জন্য।
কর্মব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে পরে স্বামী চেন্নাইতে যাওয়ার কথা বলে। চেন্নাইতে থাকাকালিন তিনি জানতে পারেন যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ফাগুনী সুমি কাসারীর সাথে বিজন জোয়ার্দারের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এমনকি তাকে বিয়ে করে সাতক্ষীরার একটি হোটেলে স্বামী- স্ত্রী হিসেবে রাত্রি যাপর করেছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি মুঠোফোনে সুমি তাকে জানায় যে, বিজনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। সে যেন বিজনকে ছেড়ে চলে যায়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি স্বামীকে ফোন দিলে রিসিভ না করায় মুক্তা চিকিৎসা শেষ না করেই ২৩ ফেব্রুয়ারি আশাশুনিতে ফিরে আসেন। বিষয়টি তিনি তার শ্বশুর, শাশুড়ি ও দেবরকে জানালে তাকে মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এ সময় সুমিকে নিয়ে কথা বার্তার একপর্যায়ে তাকে বিয়ে করেছে বলে বিজন তাকে জানায়।
এ সময় তার সঙ্গে মুক্তির সংসার করার জন্য নিজ গ্রামে নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য ৫০ লাখ টাকা বাপের বাড়ি থেকে আনতে চাপ সৃষ্টি করে বিজন। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তার উপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল তিনটার দিকে আশাশুনির নিজ কর্মস্থলের পার্শ্ববর্তী বাসায় বিজন তাকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করে। স্থানীয়রা তাকে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। বিষয়টি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন মুক্তা। এরপরপরই বিজনকে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ভুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। মামলার খবর পেয়ে শুক্রবার মোবাইল ম্যাসেজ এর মাধ্যমে মুক্তার খোঁজ নেন বিজন।
এ ব্যাপারে আশাশুনি উপজেলার সাবেক সহকারি কমিশনার (ভূমি) বিজন জোয়ার্দার বলেন, তার স্ত্রীর সাথে ভুল বোঝাবুঝির ফলে এ পরিস্তিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এ ব্যাপারে আশাশুনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামীম আহম্মেদ খান জানান, মুক্তি সরকারের এজাহারটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ সালের সংশোধিত ২০০৩ এর ১১(গ)/৩০ তৎসহ ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩১৩ /৫০৬ ধারায় বুধবার রাতে মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। উপপরিদর্শক আলমগীর কবীরকে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে।
(আরকে/এসপি/মার্চ ০৬, ২০২৬)
