মানিক লাল ঘোষ


বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের সেই অলিখিত বক্তৃতা কেবল একটি ভাষণ ছিল না, সেটি ছিল একটি পরাধীন জাতির স্বাধীনতার মানচিত্র। বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ইতিহাস মুছে ফেলার নানা অপচেষ্টার মুখে এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি ছিল রণকৌশল এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক অনন্য মিশ্রণ। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।” এটি ছিল ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে জনগণের অধিকারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একইসঙ্গে প্রস্তুতির নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা—রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।” এই একটি বাক্যেই সাত কোটি নিরস্ত্র মানুষ একটি সুশৃঙ্খল গেরিলা বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছিল। পরিশেষে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—এই ঘোষণার মাধ্যমেই কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ভাষণের আবেদন আজ সর্বজনীন। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো এই ঐতিহাসিক ভাষণকে 'মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার'-এ অন্তর্ভুক্ত করে 'বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি ছাড়া দেওয়া এই ভাষণটি পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে এই বজ্রকণ্ঠ কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়, বরং এটি শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক চিরন্তন দলিল। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো থেকে শুরু করে বিশ্ববরেণ্য রাষ্ট্রনায়করা এই ভাষণের জাদুকরী শক্তির প্রশংসা করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গৌরবকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক ৭ মার্চের জাতীয় দিবস বাতিল এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ দেখা গেছে, তা সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। জাতীয় ক্যালেন্ডার থেকে ৭ মার্চকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মূলত মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো শাসকের কলমের খোঁচায় জনগণের হৃদয়ে গেঁথে থাকা চেতনা মুছে ফেলা যায় না। ইউনুস সরকারের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করার শামিল, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্যের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির জন্য বর্তমান সময়টি এক কঠিন চ্যালেঞ্জের। তবে ৭ মার্চের ভাষণই হতে পারে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর মূল শক্তি। বঙ্গবন্ধু যেভাবে সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলে তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, আজ স্বপক্ষ শক্তিকেও একইভাবে জনগণের মৌলিক সমস্যার কথা বলে মাঠে নামতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ৭ মার্চের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং এর ঐতিহাসিক সত্যতা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। একইসাথে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাইকে রক্ষার যে অসাম্প্রদায়িক আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই চেতনাকে ধারণ করেই অপশক্তির মোকাবিলা করতে হবে।

৭ মার্চের ভাষণ একটি জীবন্ত সত্তা। একে নিষিদ্ধ করে বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান থেকে বাদ দিয়ে এর তেজ কমানো অসম্ভব; বরং বাধা যত আসবে, এই বজ্রকণ্ঠ তত বেশি জোরালো হয়ে বাঙালির কানে বাজবে। ৭ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সনদ। কোনো বিশেষ সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা এই কালজয়ী ইতিহাসকে ম্লান করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির ঘুরে দাঁড়ানোর অর্থ হলো বাংলাদেশের মূল চেতনার পুনর্জাগরণ—আর সেই যাত্রায় ৭ মার্চের ভাষণই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ পাথেয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।