ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


বাংলাদেশে পাকস্থলী ও খাদ্যনালির ক্যান্সারের হার দ্রুত বেড়ে চলেছে। নারী-পুরুষ উভয়ই আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত না হলে এটি জীবন-হুমকির কারণ হতে পারে। পাকস্থলী ক্যান্সার (গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার) মূলত পেটের আস্তরণে কোষের অপ্রতিরোধ্য বৃদ্ধি থেকে শুরু হয়।

খাদ্যনালির ক্যান্সার: সংজ্ঞা ও ঝুঁকি

খাদ্যনালি বা ইসোফ্যাগাস হলো গলা থেকে পাকস্থলী পর্যন্ত বিস্তৃত নলাকার অংশ। এটি মুখ থেকে খাবার ও পানীয় পাকস্থলীতে পৌঁছে দেয়। খাদ্যনালিতে টিউমার বা অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি সাধারণ, যার মধ্যে ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সারযুক্ত টিউমার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এটি আশপাশের অঙ্গ এবং দূরবর্তী অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ কারণ

* অপুষ্টি ও ভিটামিন/মিনারেলের অভাব, বিশেষ করে ফল ও শাকসবজির ঘাটতি

* নাইট্রোসামাইনযুক্ত বা প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তামাক বা ধূমপানযুক্ত খাদ্য

* অতিরিক্ত গরম চা, কফি বা পানীয়

ধূমপান ও মদ্যপান

* অ্যাকালাসিয়া কার্ডিয়া: খাদ্যনালির নিচের অংশ ঠিকমতো প্রসারিত না হওয়া

* গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ যা বারবার অ্যাসিড ক্ষত তৈরি করে

* রাসায়নিক বা অ্যাসিড জাতীয় দ্রব্যের সংস্পর্শ

* বয়স: ৫০ বছরের বেশি ব্যক্তি ঝুঁকিপূর্ণ

পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি ও কারণ

* বয়স: ৫০ বছরের বেশি ব্যক্তি বেশি ঝুঁকিতে

* লিঙ্গ: পুরুষদের মধ্যে বেশি সম্ভাবনা

* খাদ্যাভ্যাস: কম ফল ও শাকসবজি, বেশি নোনতা, ধূমপানজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার

* হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রমণ

* পারিবারিক ইতিহাস: যদি পরিবারের কেউ পাকস্থলী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকে

প্রকারভেদ

পাকস্থলী ও খাদ্যনালির ক্যান্সার প্রধানত দুই ধরনের:

* স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা: খাদ্যনালির শিরা কোষ থেকে শুরু, সাধারণত উপরের অংশে

* অ্যাডেনোকার্সিনোমা: পাকস্থলীর আস্তরণের গ্রন্থি কোষ থেকে, অধিকাংশ পাকস্থলী ক্যান্সার এ ধরনের

জটিলতা:

* ক্যান্সার আশপাশের অঙ্গ যেমন লিভার, ফুসফুস বা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

* খাদ্য গিলতে সমস্যা, শ্বাসনালিতে খাবার জমে শ্বাসকষ্ট

* দীর্ঘস্থায়ী অ্যাসিড ক্ষতি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়

* যদি রোগ অনেক দিন ধরে থাকে, পেট ফুলে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা অনিয়মিত বমিও দেখা দিতে পারে

লক্ষণ

পাকস্থলী ও খাদ্যনালির ক্যান্সারের লক্ষণ প্রাথমিক পর্যায়ে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো:

* খাবার গিলে সমস্যা (ডিসফ্যাজিয়া): প্রথমে শক্ত খাবার গিলে সমস্যা, ধীরে ধীরে তরলও গিলে কষ্ট হয়।

* গলায় বা বুকে ব্যথা: খাবার গিলে হালকা ব্যথা, অস্বস্তি বা গরম ভাব অনুভূত হতে পারে।

* বমি ও হজম সমস্যা: খাবার ঠিকভাবে হজম না হওয়া, বমি, বদহজম, ফাঁপা বা অস্বাভাবিক গ্যাস।

* ওজন কমে যাওয়া ও ক্ষুধাহীনতা: অজানা কারণে দ্রুত ওজন কমা।

* অপ্রত্যাশিত ক্লান্তি: রক্তস্বল্পতা বা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধাহীনতার কারণে দুর্বলতা।

* রক্তপাত: বমিতে রক্ত, কালো পায়খানা বা খাদ্যনালিতে ক্ষত হলে।

* শ্বাসনালিতে খাবার চলে যাওয়া: শ্বাসকষ্ট, কাশি, জ্বর বা সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।

ক্যান্সার ছড়িয়ে গেলে অন্যান্য অঙ্গের উপসর্গ:

* লিভারে: পেটের ডানদিকে ব্যথা, লিভার বড় হওয়া, জন্ডিস

* ফুসফুসে: শ্বাসকষ্ট, বা দীর্ঘস্থায়ী কাশি

* মস্তিষ্কে: মাথা ব্যথা, বমি, খিঁচুনি

* পাকস্থলীর অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বারবার অ্যাসিড উপরের দিকের অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে: গলা জ্বালা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি

* অন্যান্য লক্ষণ: দীর্ঘ সময় খাবারের সঙ্গে অস্বস্তি, গলা ভরা বা কষ্টকর গ্যাস, হঠাৎ খাবার আটকে যাওয়া

প্রতিরোধ ও ঘরোয়া পরামর্শ

* সুষম খাদ্য: প্রচুর ফল, শাকসবজি ও উচ্চমানের প্রোটিন

* স্বাস্থ্যকর অভ্যাস: নোনতা, প্রক্রিয়াজাত ও ধূমপানযুক্ত খাবার সীমিত করা

* ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ

* হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রমণ স্ক্রীনিং

* নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ডাক্তার পরামর্শ।

বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ২০,০০০–৩০,০০০ নতুন পাকস্থলী ক্যান্সারের রোগী শনাক্ত হয়। সতর্কতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান পরিহার এবং সময়মতো চিকিৎসা রোগ প্রতিরোধে কার্যকর।

হোমিও সমাধান

হোমিওপ্যাথিতে রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা হয়। তাই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক গন প্রাথমিকভাবে যেই সব ঔষধ পেট ও খাদ্যনালির ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অনুযায়ী ঔষধ নির্বাচন করেন। আর্সেনিকাম অ্যাল্ব, কারসিনোসিন নাক্স ভোমিকা, ফসফরাস সাইন, সাইলেসিয়া, ইগ্নেসিয়া, এসিড ফ্লু সেপিয়া বেলাডোনা, লাইকোপোডিয়াম, কোলোকিন্থ,
পাসিফ্লোরা এই ঔষধগুলো সর্বদা অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।নিজে নিজে ব্যবহার করলে রোগ আরো জটিল আকার পৌঁছাতে পারে। সাজিয়ে দিন

পরিশেষে বলতে চাই, পাকস্থলী ও খাদ্যনালির ক্যান্সার একটি গুরুতর রোগ। উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো উচিত। সুষম খাদ্য, জীবনধারা পরিবর্তন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে। রোগ “প্রাথমিক পর্যায়”-এ ধরা পড়লে চিকিৎসা কার্যকর ও জীবন রক্ষার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক।