রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : বিএনপি নেতা পরিচয়ে জমি দখল করতে যেয়ে বাদা দেওয়ায় একই পরিবারের চার নারী সদস্যকে পিটিয়ে জখম করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালের দিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মীরগাঙ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

আহতরা হলেন, পারুল গাইন, মিনতি গাইন, বন্ধনা গাইন, সুচিত্রা গাইন। মারাত্মক জখম পারুল গাইনকে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

মীরগাং গ্রামের তুষার গাইন জানান, তারা যে জমিতে বসবাস করছেন ওই জমি তার দাদু কালিপদ ম-লের খাস হওয়া জমি ও তাদের ডিসিআরকৃত। একই জমি একই গ্রামের মিজানুর রহমান ও পঁচি ভাঙী ১৯৯৬ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়েছেন বলে দাবি করে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহষ্পতিবার সকাল ১১ টার দিকে মীরগাঙ গ্রামের বিএনপি নেতা পরিচয়দানকারি জব্বার, রাজু, সিরাজুল, সালাম চৌকিদার, ইউনুছ গাজী, জঙ্গল ভাংগী, প্রিংয়কা ভাংগী, সাগর ভাংগী, পারশেমারির শাহীনুর ইসলাম, তার ভাই শাহীনসহ ৪০/৫০ জন সশস্ত্র অবস্থায় তাদের ডিসিআরকৃত জমি জবরদখলের চেষ্টা চালায়। বাধা দেওয়ায় তার মা ও তিন কাকিমাকে পিটিয়ে জখম করা হয়। জব্বার ও রাজু তাকেও ঘর থেকে টেনে বের করে আনতে যায়। এক পর্যায়ে তারা আগে থেকে বানানো সিমেন্টের পিলার, টিন ও পাটা দিয়ে ঘর নির্মাণ করে। উপপরিদর্শক কামরুল ঘটনাস্থলে এল তার উপস্থিতিতেই ঘেরা দেওয়া হয়। আহতদের নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেয় হামলাকারিরা। অবশেষে কাকিমা পারুল গাইনকে বিকেল তিনটার দিকে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পুলিশ চলে যাওয়ার পর জব্বার ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় সশস্ত্র পাহারা দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে জঙ্গল ভাঙ্গি সাংবাদিকদের জানান, আদালতে তাদের ১৪৪ ধারার মামলা আছে। আদালতের নোটিশ ভঙ্গ করায় দীলিপ গাইনদের বিরুদ্ধে তারা আদালতে ১৮৮ ধারায় নোটিশ ভঙ্গের আবেদন করেন। আদালত তাদের পক্ষে রায় দেওয়ায় তারা লোকজন নিয়ে জমি দখল করতে গেলে উভয়পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়।

শ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক কামরুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের ১৮৮ ধারার আদেশ অমান্য করছের তপন গাইন ও অন্যরা এমন অভিযোগ পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। তখন তিনি প্রিংকা ভাংগীকে একজন ভাল মানুষ ও তাদের কাগজপত্র সঠিত আছে বলে মনে করেন। তপন গাইনরা তাকে কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।তবে তার পৌঁছানোর আগেই জঙ্গল ভাঙ্গী ও প্রিয়াঙ্কা ভাঙ্গিসহ তাদের পক্ষে বেশ কিছু লোকজন ঘর বানিয়ে বেড়া দিয়ে দখলে নিয়েছে। ১৮৮ ধারায় রায় প্রিংকা ভাংগীর পক্ষে থাকায় তিনি তাদের কোন বাধা দেননি।

এ ব্যাপারে শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালেদুর রহমানের সাথে ােগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
প্রসঙ্গত, ১৭ অক্টোবর শালিসী সিদ্ধান্ত না মেনে রাত সাড়ে সাতটার দিকে মীরগাং গ্রামের জঙ্গল ভাংগী, তার ভাইপো সাগর ভাংগী, তাদের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী একই গ্রামের আব্দুর জব্বার, যতীন্দ্রনগর গ্রামের আনোয়ার ও মাহামুদুলের নেতৃত্বে ৫০ জনের ও বেশি লোকজন দীলিপ গাইন ও তার ভাইদের ডিসিআর প্রাপ্ত পুকুরসহ ৫০ শতক জমি নেট দিয়ে দখল করে নেয়। ১৭ অক্টোবর দিবাগত রাত একটার দিকে দীলিপ গাইনের বসতঘরসহ কাঠঘর ও গোয়ালঘরে আগুন লাগিয়ে ভষ্মীভূত করা হয়। এ ঘটনায় ১৮ অক্টোবর দীলিপ গাইন বাদি হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম ঘটনা সঠিক নয় বলে আসামী গ্রেপ্তারের ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেন। ২১ অক্টোবর আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করলে বিচারক তা না’মঞ্জুর করে তাদেরকে জেল হাজতে পাঠান। ওই দিন বিকেলে আদালত চত্বরে জঙ্গল ভাংগী ও সাগর ভাংগী সাংবাদিকদের জানান যে, জুব্বার গাজী, মাহামুদুল গাজী ও আনোয়ার হোসেনের সহায়তায় প্রতিপক্ষ দীলিপ গাইনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করবেন। যাহা ২২ অক্টোবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

গত ২৬ অক্টোবর রবিবার ভোর ৬টার দিকে তার ছেলে বিকাশকে ঘরপোড়ানো মামলায় কারাগারে থাকা এক আসামীর মাকে ২৫ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঘরের বেড়া ভেঙে ধর্ষণের ঘটনায় আটক করে নিয়ে যান উপপরিদর্শক জহিরুল ইসলাম। থানায় গেলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর মোল্লা ঘর পোড়ানো ও ধর্ষণ দুটিই সঠিক নয় বলে উভয়পক্ষকে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়ল ও সাংবাদিক মনিরের উপস্থিতিতে তিনি মীমাংসা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। রাজী না হওয়ায় ২৭ অক্টোবর রাতে ঘর পোড়ানো মামলার এক আসামীর মাকে দিয়ে ধর্ষণের মামলা রেকর্ড করেন। মামলায় ঘর ঘর পোড়ানো মামলার সাক্ষী পলাশ গাইনসহ তার তিন ভাইপোকে আসামী শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

আটকের ৩৩ ঘণ্টা পর ছেলে বিকাশকে ওই ধর্ষণ মামলার জেলে পাঠানো হয়। ঘরপোড়ানো মামলা তুলে নিতে রাজী না হওয়ায় মামলার আসামীর মাকে দিকে ধর্ষণের মামলার পাশাপাশি ২৪ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে কথিত ধর্ষিতার ছেলের ঘরবাড়িতে তার ভাই দীলিপ গাইন, সাক্ষী ভাইপো পলাশ, মহেন্দ্র মন্ডলসহ পরিবার ও স্বজনদের ১৫ জনকে আসামি করে ২৬ অক্টোবর আমলী ৫ম আদালতে মামলা দায়ের করেছেন ধর্ষিতার পুত্রবধূ প্রিয়াঙ্কা গাইন। মামলায় ধর্ষণ মামলার তিন সাক্ষী জব্বার, মাহামুদুলকে সাক্ষী করা হয়। পরবর্তীতে প্রিয়াংকা ভাঙ্গীর মামলার তদন্তে ও ধর্ষণ মামলার তদন্তে ঘটনার সত্যতা না পেয়ে পুলিশ আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এমনকি ঘটনার সত্যতা থাকার পরও শ্যামনগরের বহুল আলোচিত উপপরিদর্শক জহিরুল আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে জব্বার গাজীর নেতত্বে বিরোধপূর্ণ জমিতে বিএনপি লোকাল অফিস বানানোর চেষ্টা চালানো হয়।

ঘর পোড়ানো মামলা ও ধর্ষণের অভিযোগ দুটি বিষয়ই সঠিক নয় বলে উল্লেখ করে থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর মোল্লা সাংবাদিক কাম বিএনপি নেতা সামিউল মনিরের উপস্থিতিতে মুন্সিগঞ্জ সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেমকে উভয়পক্ষের সঙ্গে মীমাংসায় বসতে বলেন। ধর্ষণের কোন সত্যতা না থাকার পরও ঘরপোড়ানো মামলার বাদি দীলিপ গাইনের ভাইপোকে লকআপে রেখে ও একটি পক্ষের প্রধান জঙ্গল ভাংগি জেলে থাকায় বসাবসি সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে ২৭ অক্টোবর ধর্ষণের পর হত্যা চেষ্টার ঘটনা দেখিয়ে বিকাশসহ তার তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড করে ২৮ অক্টোবর বিকাশকে জেলে পাঠানো হয়। ডিএনএ টেষ্ট এ রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পর বিকাশ জামিনে মুক্তি পায়।

(আরকে/এসপি/মার্চ ১২, ২০২৬)